কল-কাকলি

এই মূহুর্তে মাটি থেকে ৩৫০০০ ফুট উঁচুতে আছি । 
সত্যি বলছি । 

দেশ ও দশের কাজে, মানে পেটের দায়ে, অর্থাৎ কিনা আপিসের কাজে একটু বাইরে গেছিলাম ।  উড়োজাহাজে ! আপিসেরই খরচে । এখন ফিরছি। যে কোম্পানির প্লেনে চেপেছি, তারা নাকি ওই ৩৫০০০ ফুট ওপর দিয়েই ওড়ে !

সেটা আসল কথা নয় । আসল কথা হ'ল এরোপ্লেনে বসলেই আমার দুটো মুখ মনে পড়ে । আমার বউ আর ছেলের । 
তাহলে ? আরে বাবা, আমাকে যারা উড়নচণ্ডী, বহির্মুখী বলে, তারা এসে দেখুক, কিরকম সংসার-অন্ত প্রাণ মানুষ আমি ! 

তবে যারা এমন বলে, তারা তো আর এমনি এমনি বলে না ! সে যাক গে ! আমার উড়নচণ্ডীপনা আর বহির্মুখিতা সাতকাহন ক'রে বলার জন্য তো আর ফোনের ব্যাটারি ধ্বংস করছি না ।  আসল কথা হ'ল ওদের মুখ মনে পড়ার কারণটা । 

দিল্লী -ভুবনেশ্বর উড়ান রুটে, মানে দিল্লী থেকে ফেরার সময়, অদ্ভুত একটা এয়ার পকেট আসতো।  আগে বার কয়েক ওই রুটে যাতায়াত থাকার ফলে আমি জানতাম । কিন্তু আমার স্ত্রী পুত্রের ওটিই প্রথম দিল্লী থেকে ভুবনেশ্বর ফেরা । ওদের জানা ছিল না ।

সেদিন আবার এয়ার পকেট একটু বেশিই ঝামেলা করছিল। মাঝে মাঝেই উড়োজাহাজ বাবাজীবন ডানা ঝাপটাতে ঝপটাতে মাটিতে নামবো নামবো অবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছিল এক্কেবারে । আমি মাঝের সিটে (আজ অবধি কেউ পরিবারের সাথে বেড়াতে গিয়ে জানালার পাশে বসতে পেরেছেন??) । প্লেন এয়ার পকেটে পড়লেই দু'-দিক থেকে আমার দু'-হাতে শক্ত চাপ.....দুদিকেই একই রকম ভয়ার্ত চোখ মুখ........ছেলের চোখে "বাবা, কী হবে, এখনও তো প্লেনে খেতেই দেয় নি! " আর গিন্নীর চোখে "হ'ল তো, তখনই বললাম রাজধানীতে যাই" এর টানাপোড়েনে বিদ্ধ হ'তে হ'তে খানিক সময় কাটলো । এক্সময় ব্যাপার স্যাপার স্বাভাবিক হ'ল । 'প্লেনের খাবার' পেয়ে ছেলের ভয় কাটলো । 

গিন্নি-কে বোঝালাম, ভয়ের কিছু নেই । 
ওপরওয়ালার 'মিসড কল' ছিল। 

কি আশ্চর্য  !  গিন্নি বুঝলেন । উদাহরনটা লাগসই হয়েছিল যে !

ছিল বটে একটা শব্দ-বন্ধ.......... 'মিসড কল' !

বছর তিনেকের আগে যাদের মোবাইল কানেকশন ছিল তারা মিসড কল বুঝবে না, কারণ জিও-পরবর্তী ডেটা বিপ্লব আর আনলিমিটেড কল ব্যবস্থার কল্যানে ওই মিসড কল কথাটা মনে হয় আজ শুধু স্মৃতির মিউজিয়ামেই পাওয়া যায়। আমি অবশ্য শুরুতেও মিসড কল কথাটার ওরিজিন বুঝি নি, আজও বুঝি না ।  মিসড কল যে করে, সে তো নর্ম্যাল কলই করে.......যার রিসিভ করার কথা, ডিসিশন তো সে নেবে, ধরবে নাকি মিস করবে ! তাহলে 'মিসড কল' দেওয়ার কথা কেন বলা হয় !

বেশ মনে আছে ২০০২-এ যখন প্রথম মোবাইল ফোন নিলাম, তখন ইনকামিং কলের চার্জ ছিল মিনিটে ৯ টাকা । কি ভয়ানক !! তখনও মিসড কল কথাটা শুনি নি । তখন ফোন আর ধরতাম কোথায় ? নিজের লাভের জন্যই প্রায় সব কলই তো মিসড কল ।

তারপরে বিএসএনএলের হাত ধরে প্রথম ফ্রি ইনকামিং এল । তখন আমার কল রিসিভ করতে খরচ হ'ত না ।  তবু, যারা ফোন করতো, তাদের খরচের কথা ভেবে, জনস্বার্থের তাগিদ থেকে বলতাম, 'একটা-দুটো রিং করে ছেড়ে দিও'। 😂

আর সে ছাড়ার আলাদা আলাদা নিয়ম ছিল। 
যেমন, সৌম্য (নাম পরিবর্তিত, বলা যায় না কে, কোথায়, কিসে, রেগে যায়) আর ওর গিন্নী আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড ছিল। আমাদের ব্যালকনির উল্টোদিকে, সরু রাস্তার ওপারে ওদের ব্যালকনি । ঠিক হয়েছিল, কিছু বলার থাকলে একটা রিং করেই কেটে দেবে । আমরা ব্যালকনিতে চলে যাব । কথা হবে । আবার হয়তো আমরা একসাথে কোথাও বেরোবো, তখন দুটো রিং হবে আর আমরা নেমে পড়বো । 

আজকাল যেমন শুধু ইমোজি দিয়ে বেশ লম্বা একটা কনভার্সেশন সাকসেসফুল ভাবে ক'রে দেওয়া যায়, তখন মিসড কল দিয়ে করা হ'ত । যেমন, আমি হয়ত আমার মায়ের ফোনে রিচার্জ করে দিলাম। মা আমাকে কল করলে আমি একটা রিংএর পরেই কেটে দিলাম।  মিসড কল !  এমনও তো হতে পারত যে মায়ের সত্যি সত্যি আমার সাথে দরকার আছে ।  তখন মা মাকে আবার ফোন করত ।  এবার নো মিসড কল.......কথাটা সেরে নিতাম ।

সুতরাং এই একটা, দুটো,  বা তিনটে মিসড কলের হিসেব মাথায় রাখতে হ'ত ।  যাদের সাথে মিসড কলের সম্পর্ক ছিল, তাদের ফোন এলে এখনকার মতো হুট ক'রে ধরে ফেলা যেত না, সে ভারি বিচ্ছিরি রকমের ব্রিচ অফ কনট্র‍্যাক্ট গোছের ব্যাপার হ'ত । ভুল ক'রে ফোন রিসিভ করে নিয়ে এমন বিলাপ শোনা বিচিত্র ছিল না :
-বলেছিলাম, তিনটে মিসড কল দেব । তাও তুমি ওই তিনটের মাথাতেই ফোন ধরে নিলে ? আমার মাত্র চার টাকা সাতাশি পয়সা ব্যালেন্স ছিল !!

সত্যি সত্যি, সামান্য ব্যালেন্স নিয়ে শুধু  মিসড কলের ভরসায় অনেকেরই বেশ দিনের পর দিন চলে যেত । এই ব্যাপারে কলকাতার মানুষদের বিশেষ দুর্নাম ছিল বলে শুনেছি । আমার এক ভায়রা ভাই-এর কাছে শুনেছি, দিল্লির সি আর পার্কের বাঙালিরা কলকাতার লোকেদের ফোন এলে ফার্স্ট রিং-এই রিসিভ ক'রে নিত । নইলে নাকি ওরা নির্ঘাত মিসড কল ক'রে দেবে !! 

একটা ভদ্রলোকের চুক্তি চলতো । ধরা যাক কেউ আমাকে ফোন করবে তার নিজের কাজে ।  তখন কিন্তু সে কলই করবে, মিসড কল নয় । কিন্তু যে কোনো নিয়মের মতো চুক্তিও তৈরি হ'ত ভাঙারই জন্য । ফলে, এমন ঘটনা ব্যাতিক্রম ছিল না যখন কেউ সম্পূর্ণ নিজের প্রয়োজনে মিসড কল করেছে, এমন ঘটনা আকছার ঘটতো । তাই আমার মতো কেউ কেউ ডিসাইড করেছিল, আননোন নাম্বার বা তেমন কোনো ভুলভাল নাম্বার থেকে মিসড কল এলে কল ব্যাক করবে না । কেউ ছিল আরও সরস ।  যেখান থেকে মিসড কল এল, সেই নাম্বারেই মিসড কল করে দিত......... পুরো নার্ভের খেলা, শেষ পর্যন্ত যে নার্ভ ধরে রাখতে পারবে না, সে-ই  মিসড কলের বাইরে গিয়ে 'কল' করবে !

তবে এই খেলায় একটা তৃপ্তির ব্যাপারও ছিল । মিসড কলের নার্ভের খেলায় হেরে গিয়ে যখন শেষ অবধি আ্যকচুয়ালি কল করছি, তখন মনে কেমন একটা উদারতা ভর করতো । মনে হ'ত, এ' দেশের আর্থিক বৈষম্যের কারণে যারা পিছিয়ে থাকলো, তাদের কিছু পয়সা না হয় বাঁচিয়েই দিই !

কে মিসড কল দিচ্ছে, আর কে তার উত্তরে আসল কল করছে, সেটা থেকে বোঝা যেত কার আর্থিক বা সামাজিক প্রতিপত্তি বেশি । তাই ধনীগোছের কোনো বন্ধু মিসড কল করলে, অথবা কাউকে মিসড কল দিতে বলার সময় বেশ একটা 'আহা, আমি কী হনু' গোছের একটা বোধ জাগতো ।

তবে কিছু মানুষের আত্মসন্মান বোধ একটু বেশি রকমের বেশি হ'ত । আমাদের ভুবনেশ্বর অফিসে ড্রাইভার ছিল প্রভাত ।  যখন বললাম, 'আমাকে কল কোরো, আমি কেটে দিয়ে কল ব্যাক করবো', বেচারি মাথা নীচু ক'রে বলেছিল, 'মিসড কল জিনসঅটা মোতে ভলঅ লাগু নি, মু এমিতি কল করিবি।' বুঝলাম, এ ব্যাটা অন্য ধাতুতে গড়া ।  তখন ওকে বোঝালাম,  'আমি তো মিসড কল করতে বলি নি, তুমি নর্ম্যাল কল করবে, আমিই তো ধরবো না' ! তবু, ওর মন ভাল রাখতে আনি ওর ফোন ধরতাম । তবে মাঝে মাঝে ওর মোবাইল রিচার্জ করে দিতাম । বলেছিলাম,
-তুমি তো আমাকে অফিসের কাজে ফোন কর, তাহলে নিজের পয়সা খরচ করবে কেন ?
ও মেনে নিয়েছিল ।

হ'ত পারে মিসড কল দেওয়ার স্কিল ওর ছিল না, তাই এমন বলেছিল । উফফফ ! সে একটা কায়দা বটে ! 

তখনও টাচ স্ক্রিন ফোন এমন 'সর্বত্র পূজ্যতে' নয়, অধিকাংশ ফোনই ওই বাটন-ওয়ালা।
ফোনের 'কল' বাটনটা চাপার পরেই হাত চলে গেল 'ডিসকানেক্ট' বাটনে ।
ফোনের স্পীকারটা কানের ভেতরে প্রায় ঢুকেই গেল ।
চোখমুখ পাকিয়ে ফোনের মালিক অপেক্ষা করছে ফোনটা কানেক্ট হওয়ার জন্য ।
যেই না কানেক্ট হ'ল, মুখে একটা 'ইউরেকা' মার্কা এক্সপ্রেশন !  তারপর কুটুস ক'রে ডিসকানেক্ট করা...... মিশন আ্যকমপ্লিশড ! 

আজ যখন স্পীকার ফোন আর টাচ স্ক্রীনের দৌলতে মিসড কল করা মোটেও কঠিন কাজ নয়, সেই মিসড কলটা করতেই হয় না প্রায় ! সেই গল্পটার মতো, যেখানে নিজের হাতঘড়ি বেচে গার্লফ্রেন্ডের জন্য একটা দারুণ হেয়ার-পিন এনে একজন দেখলো যে বান্ধবী তার মাথার একরাশ চুল বিক্রি ক'রে বয়ফ্রেন্ডের জন্য ঘড়ির ব্যান্ড কিনে এনেছে ! 

বাপ রে !  কী ভারী ভারী কথা !  এত ওপরে উঠে এসে জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী পালটে গিয়ে দার্শনিক টার্শনিক হয়ে গেলাম নাকি রে বাবা ! নাকি ৬০ ঘন্টার বেশি সময় (বাই চয়েস) ভাত আর (পাই নি ব'লে) ভাল চা না জোটার কারণে আসা বৈরাগ্য ? কিন্তু মাটন সাওজি আর মুলচান্দের তৈরী কান্ট্রি চিকেন সাওজি তো গুছিয়ে খেলাম ! তবে ? কে জানে......

জানি, অপ্রাসঙ্গিক, তবু বলি, কর্নাটকের উত্তরদিক অথবা এই নাগপুর অঞ্চলে এলে বিদর্ভ-ক্যুইজিনের অন্যতম সেরা এই আইটেমটা খেতেই হয় । অসামান্য স্বাদ, মশাই !!

প্রসংগে ফিরি ।  সেই দুর্মূল্য আউটগোয়িং-এর সময়ে আমি একটা স্কিল অর্জন করেছিলাম৷। ঘিড়ি না দেখেই ৫৭-৫৮ সেকেন্ডের মাথায় কতবার ফোন কেটেছি ! ৪৫-৫০ সেকেন্ডের পরেই কথার স্পীড বেড়ে যেত, আবার যেই বুঝতাম যে কেটে লাভ নেই, এক মিনিট হয়ে গেছে, দুলকি চালে কথা চালিয়ে যেতাম।

একটা অন্য ঘটনা মনে পড়ছে ।  একডালিয়ার বইয়ের দোকান 'গ্রন্থ'-তে গেছি।  বেশ ভিড়।  দোকানীর কাছে ফোন এল৷ বুখলাম, ফোনটা আগেও অনেকিবার এসেছে ।  আরো বুঝলাম৷ কোনো একটা বইয়ের খোঁজ চলছে ।  ফোন ছেড়ে তিরিক্ষি মেজাজে দীকানী বললো,
-শালা এই জিও ফোন এসে ব্যবসার বারোটা বাজালো ।  কাল থেকে বলছি, বইটা সোমবার আসবে, তবু ফোকটের ফোন পেয়ে বারেবারে ফোন করছে !  কাস্টমার সামলাবো, না ফোন !!

শুনে ঝাকুনি লেগেছিল ।  কিন্তু এখন আবার ঝাকুনি লাগছে কেন ?  যাচ্চলে........আবার ওপরওয়ালার মিসড কল !  আবার এয়ার পকেট !! 

ওহ, বিমান "অবতরণ" করেছে । আমার বউটা এবারও  ইন্স্যুরেন্স-এর টাকায় বড়লোক হওয়ার সুযোগ পেল না !  বেচারি..........।  এবার প্রথমেই মাকে একটা ফোন করতে হবে ।  পৌঁছ সংবাদ ! 

তারপরে দৌড়তে হবে । বেরিয়েই কেষ্টপুরের কাছে ওই ঝুপড়ি দোকানটায় একটা ভাল চা । একটা সিগারেট  !
লাইফ ইজ গুড !!

Comments