জয়-যাত্রা

জয়-যাত্রা ।।

***************************

-আমি আর কোনোদিন ফিরে আসবো না, মা !

সাধারণ একটা কথা ।
যিনি বলছেন, তিনি অবশ্য এত সাধারন ভাবে বলবেন না ।
-আমি (নিজের বুক চাপড়ে), হাআমি -----
-হাআআআমি হাআর কোনওওওদিন
(বলতে বলতে র‍্যাম্প দিয়ে নামতে নামতে হঠাৎ ইউ-টার্ণ, তারপর আবার উঠতে উঠতে বলবেন)
-মা গোওও, হাআআআমি আর কোনওওদিন ফিরে হাআসবো নাআআ,
(মায়ের মুখের সামনে হাত জড়ো করে)
-মাআআ,
-কোনওওওদিন ফিরে হাআসবো নাআআ,
-কোনওদিনও ফিরে আসবো নাআআ.......
বলতে বলতেই পেছনো চলছে,
তারপর আচমকা তাঁর র‍্যাম্প বেয়ে নেমে যাওয়া !

তুমুল হাততালি শেষে শোনা গেল ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ ।
মহিলাদের অনেকেই চোখ মুছছে ।

যাত্রা চলছে !

"সম্পর্কের ওঠানামা, পরিবারের অবক্ষয়ের পটভূমিকায়, পালাকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের বলিষ্ঠ লেখনী -প্রসুত সামাজিক যাত্রাপালা"
ইত্যাদি ইত্যাদি......

সে এক সময় ছিল ।
পূজো শেষ হ'ল কি হল না,
শরৎ হেমন্তকে জায়গা ছাড়বে ছাড়বে করছে,
তুবড়িতে শেষ রাউন্ড বারুদ ঠুসছে বাজীর কারিগর,

আর ঠিক তখন,
গাঁ-গঞ্জ আর মফস্বলি আধা শহরের নায়েকরা ভিড় জমাচ্ছে অধিকারীদের দপ্তরে দপ্তরে ।
এবারে কী পালা আসছে, ভায়া ?
বায়না চালু হয়েছে তো ?

অধিকারী হলেন তাঁরা, যাঁরা যাত্রাদল চালান । আর যাঁরা তাঁদের নিজের নিজের জায়গায় নিয়ে গিয়ে যাত্রার আসর বসান, তাঁরা হলেন নায়েক । তাদের সম্পর্ক যেন নাচনী আর তার রসিকের, একে অন্যে বিনে অসম্পূর্ণ !

প্রতিবছর রথযাত্রা আর মহালয়ার দিনে খবরের কাগজে তিন-চার পাতা জুড়ে যাত্রাপালার বিজ্ঞাপন । নটসূর্য্য রাখাল সিনহা, যাত্রা জগতের মহানায়ক স্বপনকুমার, মহানায়িকা স্বপ্নাকুমারী, নটসম্রাট অরুন দাশগুপ্ত, নটসম্রাজ্ঞী বীনা দাশগুপ্তা, লাস্যময়ী নায়িকা বর্ণালি ব্যানার্জী, গায়ক-নায়ক বিমলেন্দু ভট্টাচার্য, এমনকি ডার্ক শেডের রোলের মাস্টার, শিবদাস মুখার্জী.......... গা ছমছমে নাম সব ।  তার ওপর বিজ্ঞাপনের ছবিতে শরীর-বিভঙ্গে আরও কত দুর্নিবার আকর্ষণ !
উঠতি নায়েকরা সেই দেখেই পালার বায়না করতো ।  আর যারা পোড় খাওয়া নায়েক, তারা বায়না করতো শুধু নায়ক-নায়িকা আর অধিকারীর নাম দেখে । আর দেখতো কি গোত্রের পালা হবে, সেইটা ।  আনন্দলোক অপেরার ঐতিহাসিক পালা, নট্ট কোম্পানীর সামাজিক পালা, রাখাল সিনহার দলের (নাম ভুলে মেরেছি......) পৌরাণিক পালা......... নিজের নিজের জ্যঁর-এ এদের ছিল একাধিপত্য ।

চড়া মেক আপ, জগঝম্প আবহ, ভয়ানক মেলোড্রামা-জড়ানো সংলাপ, মোটা আর চড়া দাগের অভিনয়.........যাত্রার অবধারিত অনুষঙ্গ ছিল । কিন্তু তাতেও, কি ভয়ানক প্যাশন ছিল মানুষের ! 

নবান্নের ধান ঘরে উঠল মানে চাষী এবার মাতবে যাত্রাপালায় ।  নিজের গাঁয়ে তো বটেই, আশপাশে যেখানে আসর বসবে, সেখানেই সপরিবারে হাজির হবে মানুষ ! যাত্রা শুরু হবে ঘড়ি ধরে, যাতে পালা শেষ হলেই দৌড়ে গিয়ে লাস্ট ট্রেন ধরতে পারে সবাই । নামকরা সব দলগুলোর পালা দেখতে না পারলে, মিছেই এ' জীবন !

প্যাশন ছিল নায়েকদেরও । একটা ভাল যাত্রাপালার আসর বসালে আর্থিক লাভ হয়তো হ'ত ।  কিন্তু বেশির ভাগ নায়েক আসর বসাতো নেশায় ।  জমি-জিরেত বন্ধক দিয়ে বালিচকের এক নায়েক 'নগরবধূ'-র বায়না করেছিলেন শুধু বর্ণালী ব্যানার্জিকে নিজের জায়গায় নিয়ে আসতে পারবেন ব'লে ।  'স্বপনকুমারের অমানুষ না দেখা অবধি অন্য পালা দেখবো না' ব'লে ধনুর্ভঙ্গ পণ করেছিলেন আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক ।

'গেঁয়ো সংস্কৃতি'-র ট্যাগ লাগিয়ে, নাক কুঁচকে, যাঁরা যাত্রা দেখলেনই না, তাঁরা জানলেনই না, জীবনে কি মজাই না হারালেন ।
যাত্রা শুরুর আগে দলের টেকনিশিয়ানরা এসে স্টেজের লাইট আর মাইক চেক করতো ।  প্রতিটা মাইক্রোফোন আর ক্যাচার টেস্ট হচ্ছে, অবিরত নিভছে-জ্বলছে আলো । সেই আলোছায়ায়, খোসা ছাড়িয়ে চিনেবাদাম খেতে খেতে পড়তে হচ্ছে 'প্রোগ্রাম' (ওতে প্রতিটি সিন-এ যে যে চরিত্র মঞ্চে আসবে, তাদের নাম লেখা থাকতো ।  ইন অর্ডার অফ আ্যপিয়ারেন্স) ।

সেসব চুকলে, তৃতীয় ঘন্টা বাজা মাত্রই শুরু হ'ত মিউজিক ।  সুর-পার্টি  হারমোনিয়াম, বাঁশি, খঞ্জনী আর ঢোলের সাথে যা আবহ তৈরি করত, পালার মূল সুর বাঁধা হ'ত তাতেই । আমাদের মতো পুঁচকেদের মধ্যেও শুরু হ'ত উত্তেজনা আর ছটফটানি ।

আমাদের ছোটদের সময় কাটতো ভারি মজায় । দুপুরে 'দল'-এর লোকেদের খাওয়া দেখা, সন্ধ্যে হতেই স্টেজের পাশের মেক-শিফট গ্রীনরুমের ফাঁক ফোকরে উঁকি দিয়ে মেক আপ দেখা (দুপুর বেলাতেও যে মানুষটা টিউবওয়েলে স্নান করছিল৷ সে কেমন হঠাৎ করে বিভীষণ হয়ে গেল !!), আর অবশ্যই, (হাইট কম হওয়ার আ্যডভান্টেজে) সুর-পার্টির পাশে বসতে পারা ।

এই সুর-পার্টির পাশে বসে একবার গোল বাঁধিয়েছিল আমার ছোটকাকু । পালাতে যে ডাক্তারের পার্ট করছিল, তার পা টেনে ধরে এক্কেবারে চিত্তির !  মায়ের কাছে শোনা সে' গল্প ।  যাত্রা-পার্টির লোকজনকে স্নান করতে দেখে কাকুও তাদের সাথে পুকুরে নামে ।  স্নান সেরে উঠে দেখে পূজোয় কেনা জুতোজোড়া হাপিস । যাত্রা চলার সময় সুরপার্টির পাশে ব'সে হঠাৎ চোখে পড়ে, যাত্রার ডাক্তারের পায়ে ওরই চটি । উত্তেজনার বশে মানুষটার পা টেনে ধরে কাকু ।  আমার কাকু বলে তিনি এমন, নাকি আমি তার ভাইপো ব'লে.........এ রহস্য এখনও ঘোচে নি ।

যাত্রার আরও একটা ধারা ছিল ।  শখের যাত্রা ।  এখন যেমন পূজো মানেই নামী-দামী শিল্পীদের নিয়ে অনুষ্ঠান, তখন পূজোতে একদিন হ'ত কলকাতার নামীদামি দলের যাত্রা, একদিন আশেপাশের পেশাদার অথচ সস্তা দলের যাত্রা আর একদিন অবশ্যই নিজেদের যাত্রা, শখের অভিনয় ।  তাতে পাড়ার সবাই মিলেই অভিনয় করত । আমাদের মতো কচি-কাঁচাদের কাছে সে ছিল এক মস্ত মজার বিষয় ।  হবে নাই বা কেন ! পার্ট ডিস্ট্রিবিউশন থেকে মহলা (রিহার্সাল ? ধ্যুস !  ওটাকে মহলাই বলা হ'ত, মানে বলতে হ'ত.....সেটাই ছিল দস্তুর) সব কিছুতেই বড়দের সাথে গা ঘষাঘষির এমন সুযোগ আর কোথাও ছিল না যে । 
পার্ট বিতরণের সময় ঝামেলা অনিবার্য, সবাই হিরো হতে চায় । আমার বাবার অফিসের রিডার-কাকু তখনই পঞ্চান্ন, কিন্তু তিনি সিংহলের যুবরাজ সাজবেনই ।  মন্টুকাকু ওঁর মুখের ওপর ব'লে দিলেন, 'গাল তো শুকনো আমের আঁটির মতো, তাও যুবরাজ' !  তবু রিডার কাকু অনড়, তিনি হিরোই হবেন । শেষে আমার বাবা, চাকরিতে ওনার বস হওয়ার সুবাদেই নিশ্চয়ই, ওঁকে সেনাপতির বন্ধুর পার্ট দিয়েই চুপ করাতে পারলো । 
প্রহ্লাদদা ছিল থানার হোমগার্ড । ওর সাইড ইনকাম ছিল মিথ্যা সাক্ষী দেওয়া । নিজের কানে ওকে আমি কাঁথির কোর্ট কম্পাউন্ডে দাঁড়িয়ে মক্কেলের সাথে দর কষাকষি করতে শুনেছি । সে নাকি ঠিকঠাক রফা না হ'লে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মক্কেলের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দিয়ে দিত ! সেই প্রহ্লাদ-দা আবার দারোয়ান হুকুম সিং-এর পার্ট পেয়ে বড়ই খুশি ।  হোক না একটা মাত্র সিন, তরোয়াল হাতে স্টেজে তো ওঠা যাবে !
এসব যাত্রার আর একটা মজা ছিল । ঐতিহাসিক,  পৌরাণিক,  সামাজিক, যে গোত্রেরই পালা হোক, স্টেজে গিয়ে সেটা কমেডি হয়ে যেত ।
যেমন, স্ক্রিপ্টের হিসেব মতো আমাদের বিমানকাকু (থানার এসআই) সেনাপতি সেজে যেই বলবে "হুকুম সিং", ওমনি সে তরোয়াল নিয়ে মঞ্চে উঠে বলবে, "জী হুজুর"........
সেই সিন এল ।  সেনাপতি বললো, 
-হুকুম সিং !
দেখা গেল, হুকুম সিং আগে থেকেই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিল ।  দর্শকের অট্টহাসি শুনে ভুল বুঝতে পেরে খানিক লেবড়ে দাঁড়িয়ে রইলো ।  তারপর নিচে নেমে গেল, আর স্টেজে ফিরে এসে বললো
- জী হুজুর
(সেনাপতি) - এখুনি আমার হাতে তরবারি তুলে দাও । শত্রুপক্ষের শেষ না দেখে আজ আমি জলস্পর্শ করবো না........... হুহুহোহোহোহাহাহহা (অট্টহাসি) ।
- (হুকুম সিং) স্যার, তরোয়াল আনতে ভুলে গেছি ।  এক্ষুণি এনে দিচ্ছি  স্যার !
তারপরে সেনাপতি থানার ভেতরে ওকে কি করেছিল সেটা খুব তদন্ত-সাপেক্ষ নয় হয়তো ।
আমার দাদাও সেই দলে সুযোগ পেত ।  আরে, পাবে না ?  বিমলেন্দু ভট্টাচার্যের আপন ভাই ওর বন্ধু ছিল যে । শিবদাস মুখার্জির নিজের ভাই ওর বাবার (আমারো বাবা, অবশ্যই) কোলিগ.........পেডিগ্রির দাম নেই !! 
হুঁ হুঁ, ব্বাওয়া, সেই শিবদাস মুখার্জির আপন ভাইপো আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে !
দাদার ডায়ালগ ছিল,
(রাজার দিকে তাকিয়ে) মহারাজ, আপনি সেনাপতিকে আদেশ করুন, আমাকে যেন উনি যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন ।
ঠিকঠাক বললো, শুধু রাজার বদলে সেনাপতির দিকে তাকিয়ে আর 'সেনাপতিকে আদেশ করুন' কথাটা রাজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললো, এই যা ! দর্শক তো বটেই, স্টেজে দাঁড়িয়ে সরলকাকু (রাজা) আর বিমানকাকু (সেনাপতি)-ও অবাক হয়ে গেল.......কবে চার্জ হ্যান্ডওভার হ'ল রে বাবা !!

নাহ, আটভাট কথা শেষ । আবার সেই সিরিয়াস যাত্রার কথায় আসি । সামান্য ডায়ালগকে অদ্ভুত মড্যুলেশনে ফেলে, ফিসিক্যাল আ্যক্টিং-এর চূড়ান্ত রূপ দেখিয়ে মানুষগুলো শুধু হাততালি শুনতে চাইত । আর তার মোক্ষম চান্স ছিল "গেট"-এর সময়, অর্থাৎ সিন থেকে বেরোনোর সময়টা । একটা উদাহরণ তো শুরুতেই দিয়েছি । আরেকটা বলি ।
সেটা একটা সামাজিক পালা । চাকরের পার্টে ফাটিয়ে অভিনয় চলছে । ঘটনাচক্রে, বাড়ির নতুন বৌ আর তার প্রেমিক (যে ওই বাড়িতেই তার মামাতো ভাই সেজে আছে) ষড়যন্ত্র ক'রে চাকরকে তাড়িয়ে দিচ্ছে । আচমকা চাকরের হাত থেকে কিছু কাগজ পড়ে গেল ।  সেই কাগজ থেকে জানা গেল, চাকরটি আদতে বিএ পাস ।  বৌমার নিরুপা রায় টাইপের শাশুড়ি প্রশ্ন করলেন,
-তুই যে, বিএ পাস, আগে বলিস নি কেন ? শুরু হ'ল গেট    -

-লজ্জা পেয়েছিলাম মাআআ গো, লজ্জা পেয়েছিলাম.........এই সার্টিফিকেট নিয়ে দরজায় দরজায় ঘুরেছি, কেহেহেউ চাকরি দেয় নি.......তারপর, তারপর যঅঅঅখন আত্মহত্যা করার কথা ভাবছি, আআআপনি আর বাবু আমাকে আশ্রয় দিলেন.......প্রথম দিকে কষ্ট হত, জানেন মা, খুব কষ্ট........ বিএ পাস হয়ে চাকরের কাজ করতে লজ্জা করতো........কিন্তু আআপনাদের বুকভরা ভালবাসা আর স্নেহে কখন যেন ভুলেই গেলাম যে আমি বিএ পাস..........তঅঅবে আজ এই বিএ পাস বোউদিমনি আমার সাথে যা করলেন, আমার চোখ খুলে গেছে মা জননী......আজ আবার লজ্জা করছে..........তবে চাকর হওয়ার জন্য নয় মা.....সে তো আমার নতুন জীবন.........বিএ পাস বৌদিমনির এই চরিত্র দেখে...........নিজেকে বিএ পাস বলতে আমার লজ্জা লাগছে.......লজ্জা লাগছে......ভাআআআআরিই লজ্জা লাগছে.......

তারপরে যা হাততালি পড়েছিল, আজও মনে আছে ।  এই হাততালিগুলোই "গেট" ।  এবছর ভাল গেট পেলে সেই অভিনেতার পরের বছরের জন্য বেশি পারিশ্রমিক বাঁধা ছিল । যত ভাল অভিনেতা, তার তত বেশি গেট-এর চান্স আবার যার যত ভাল গেট, তার তত বেশি সুযোগ !!

এই গেট কনসেপ্ট-টা কমতে শুরু করলো দুটো কারণে ।
এক, যাত্রায় টলিউডের অনুপ্রবেশ......এমনকি সুপ্রিয়া দেবীর মতো নামী, ললিতা চ্যাটার্জির মতো গ্ল্যামারাস অভিনেত্রীরাও যাত্রায় এলেন ।  গলা বাঁচিয়ে, ইমেজ বাঁচিয়ে যাত্রা করতে গিয়ে তাঁরা বকচ্ছপ তৈরী করতে থাকলেন...........।
আর দুই, ওয়ান ওয়াল যাত্রা । "গেট" ব'লে কিছু থাকলোই না......... যাত্রা হারালো তার ওরিজিন্যালিটি, সংগে মাস অ্যাপিলও ।

তখন আমি পুরুলিয়াতে ।  উদ্যোক্তারা নেমন্তন্ন ক'রে নিয়ে গেলেন ।  প্রথম সারিতেই সিট । এখনকার এক বিধায়ক তখন উঠতি নায়িকা । আবহে, সংলাপে, পরিবেশনায় টোটাল শহুরেপনা ! একবারের জন্যও মনে হ'ল না যে যাত্রা দেখছি । একটা সিনও মনে নেই৷।

অথচ তার অনেক আগে কোনো এক পূজোর সময়ে ওই 'আশেপাশের সস্তার দল' ক্যাটেগরির যাত্রা দেখেছিলাম । যাত্রার শুরুতে রবীন্দ্রনাথের 'অভিসার' কবিতার সাথে সাথে একটা নৃত্যনাট্য হয়েছিল । তার প্রতিটি মুহুর্ত মনে আছে । আমার এই কম ক্যাপাসিটির মাথাতে আজও ওই একটি মাত্র বড়সড় কবিতা সেভড হয়ে আছে । অভিসার । যাত্রার মাস আ্যপিল এমনই ।

যাত্রার আমি বড়সড় সাপোর্টার ।  তবে কেউ যদি আমার কথা শুনে উড়িয়া যাত্রা দেখেন, সে দায় আমার নয়......পস্টো বলে দিলুম ! সে এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা ।  মহাভারত পালা চলছে ।  দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সিন ।  এতক্ষন যে দ্রৌপদীর সুন্দর ফিগার ছিল, তিনি মোটাসোটা হয়ে স্টেজে এলেন ।  দুর্যোধন শাড়ি ধরে টান মারতেই  অন্য মঞ্চে লাইটের প্রোজেকশনে দেখানো হচ্ছে, কৃষ্ণ সোনালী রংগের শাড়ি ছেড়েই চলেছেন ।  আর মঞ্চে দ্রৌপদী ক্রমশঃ ক্ষীণ-কায়া হচ্ছেন ........ পেঁয়াজের খোসার মত একটার পর একটা শাড়ি বেরোচ্ছে....... আর নিশ্চিতভাবেই প্রতিটির রঙ আলাদা !! দর্শককূল হইচই করে ওঠায় ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে মাইকে খ্যানখেনে গলায় ধমক ভেসে এল,

-নীরবঅ, নীরবঅ, নীরবঅ..........

আমাদের হস্টেলের বারান্দায় মাঝে মাঝেই যাত্রা করতো কানাই হাঁসদা আর কাজল । কাজল আবার রোজকার সংলাপও যাত্রার মতো ক'রে বলতে পারতো ।  সেদিন শুনলাম ও ওদের গ্রামে একটা স্কুলকে ফাইনান্সিয়াল সাপোর্ট দেয়, যারা ছবি আঁকা, গান গাওয়া ইত্যাদির সাথে সাথে যাত্রায় অভিনয় করাও শেখায় । তোর প্যাশনকে হ্যাটস অফ, কাজল !!

যাত্রা নিয়ে আমার কথা সহজে শেষ হবে না । মাঝে মাঝে "অতিথি"-র তারাপদ হ'তে ইচ্ছে করতো ।  ওই যে, শেষে তারাপদ যাত্রা দলে চলে গেছিল, তাই !! ওর মতো পাঁচালি জানি না, তাই আমার ইচ্ছে করতো বিবেক-এর গান গাইতে । নট্ট কোম্পানীর খোকন বিশ্বাসের মতো । 'ময়লা কাগজ' -গাওয়া "যদিদং হৃদয়ং তব" । উফফফ্ !!
হালকা গানও হ'ত । হঠাৎ বড়লোক দাদার বিপুল সম্পত্তি দেখে এসে ভাই গাইছে,

"আল্লাহ জিসকো দেতা,
ছপ্পড় ফাড়কে দেতা ।
আল্লাহ জিসসে লেতা,
কান পকড় কে লেতা । "

শুনে ভাইয়ের বউ কেঁদে কেঁদে গাইছে,
"আ্যঁ-আ্যঁ-আ্যঁ-আ্যঁ
আমাকে আল্লাহ কেন দেয় না "

ঠিক !  মর্জিনা আবদাল্লাহ !  লোকনাট্য অপেরার ।

যাত্রার লোকেদের দেখে মনে হ'ত, আজ হুগলীতে তো কাল বহরমপুরে...... বাসে ক'রে লম্বা লম্বা জার্নি..... গ্রীন রুমে ব'সে সাজ-গোজ করা......... রোজ সুর-পার্টির বাজনা শোনা........কি হিংসে করার মতো জীবন !!

কতদিন যাত্রা দেখি না !  স্টেজ, সুর-পার্টি আর সাজঘরের চার্ম কবেই শেষ !  তবু যাত্রা নিয়ে ভাবতে বসলেই মন ভাল হয়ে যায়............  

'সাজঘর' বললেই ছোটবেলায় শোনা সেই যাত্রার গল্পটা মনে পড়ে.........

গাঁয়ের যাত্রায় লখাই, সীতা  সেজেছে ।
পালায় এবার সীতার সিন শুরু হবে, কিন্তু লখাই বিড়িতে মশগুল ! 
লক্ষ্মণ এসে বললো,

-সীতে, সীতে, রাম ত্যুরে বুলাইলো লিতে ।
-ম্যু ইখন যাবক লাই ।  দেইখতে লারছিস, ম্যু ইখন বিড়িটো খাঁইন্ছি বটে !!
-দ্যাখ ন ক্যানে সীতে, দেরিটো ক্যইরিস লাই । দেরিটো ক্যইরলে ত্যুয়ার চুল ধ্যইরে হিঁচকায়ে ল্য্যিয়ে যাবহো বটে !
-কি ?  ইত্তো বঢ়অ কথা !!  তু ম্যোর চুলটো ধ্যোইরে হিঁচকাইবি ?? 
(একটানে পরচুলাটা খুলে ফেলে)

-ই ল্যে ত্যুয়ার চুলটো । ম্যু তো মরদ ব্যাটা !!

Comments