স্মৃতির রঙ হলুদ
আজ সরস্বতী পূজো । নাকি, কাল ছিল ? আজকাল এই এক ধ্যাষ্টামো শুরু হয়েছে । তিথি নক্ষত্রগুলো সব ঘেঁটে যাচ্ছে । তা এক দিকে ভালই হয়েছে, দু'-দিন ধরে হলুদ পাঞ্জাবী আর হলুদ শাড়ি দেখা যাবে ।
হলুদ পাঞ্জাবী অবশ্য আমাদের ছোটবেলায় সেই মফস্বল শহরে তেমনভাবে চোখে পড়তো না । ভাগ্যিস ! আমার গায়ের রঙের কারণেই, হলুদ পাঞ্জাবীতে আমাকে নির্ঘাৎ চিতা বাঘের মত দেখাতো ! এবং, অবধারিতভাবেই, রুগ্ন চিতাবাঘ !
অনেক বছর পরে এবার আবার সরস্বতী পূজোয় জড়িয়েছি । যেখানে নতুন ঠিকানা হ'ল, সেই হাউসিং-এর পূজোর কাজে টুকটাক ইনভলভড হয়েছি আর কি ! আবার সেই ঠাকুর আনা, প্যান্ডেল সাজানো, সব করলাম । হালকা বৃষ্টি হওয়ায় খানিক ডিসাস্টার ম্যানেজমেন্টও, সেইইই ছোটবেলার মতো ।
তখন সরস্বতী পূজো মানেই স্কুলে যাওয়া, সবাই একসাথে খিচুড়ি খাওয়া, গার্লস স্কুলের দিকে কাতর চোখে তাকিয়ে বিশেষ কাউকে খোঁজা ! নাইনের ছাত্ররাই বরাবর সরস্বতী পূজোর দায়িত্ব পেতো । সেই দায়িত্বের একটা বড় পার্ট ছিল স্কুল থেকে বানানো কার্ড নিয়ে বিভিন্ন সরকারি অফিস, অন্যান্য স্কুল, এসব জায়গায় নেমন্তন্ন করতে যাওয়া । হ্যাঁ, গার্লস স্কুলেও ! সারা জীবনে একবারই ক্লাস নাইন, একবারই গার্লস স্কুল ! সেদিন সবচেয়ে পরিস্কার ইউনিফর্ম পড়তে হয়, সেকথা নাইনে ওঠার আগেই সবাই জেনে যেতো । একটাই চাপ থাকতো, ক্লাসের টপ পাঁচজন স্টুডেন্টই যেতে পারবে, এটাই ছিল অলিখিত নিয়ম। মেরিটের সাথে মাস্টারমশাইরা যদি নৈতিক চরিত্র গুলিয়ে ফেলেন........কোনো মানে হয় ?
তবু, সেই খুড়োর কলে পড়ে ক্লাস এইটের আ্যনুয়াল পরীক্ষার আগে সব্বাই হেব্বি পড়াশোনা করতাম ! ব'লে রাখা ভাল, আমি কিন্তু যেতে পেরেছিলাম ! হুঁ হুঁ, লেখাপড়া করে যে, আ্যডভান্টেজ পায় সে !
তখন আমরা সবাই ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি । পূজোর ঠিক আগের উইকএন্ডে হোস্টেল থেকে বাড়ি এসে ঠিক করলাম, সরস্বতী পূজো করবো। সেদিন সন্ধ্যে থেকেই চাঁদা তোলা শুরু । কাজেই, বাজেট বড্ড কম । চাঁদা তোলার পরে চা খাওয়ার টাকাটাও দিত না ক্যাশিয়ার ।
তা, ঠাকুর আনার খরচ বাঁচাতে শিবুদার কয়লার দোকানের ভ্যান রিকশা বুক করা হ'ল । ও বারো টাকা নেবে, আর আশপাশের ভ্যানওয়ালারা পঁচিশ টাকা হাঁকছে ! পূজোর আগের সন্ধ্যেতে সেই ভ্যানওয়ালা মক্কেলের দেখা নেই। শিবুদা মহানুভব! বললো, ভ্যানওয়ালা ছাড়া ভ্যান নিলে ফ্রিতেই দেবে। অগত্যা, এই ফিল্ডে বিশেষ খ্যাতির কারণেই হয়ত, সেই হাড়কেপ্পন ক্যাশিয়ার আমাকে প্রপোজ করলো,
-তুই তো রিকশা চালাতে ভালোবাসিস । ঠাকুরটা এনে দে না তাহলে !
-আমাকে টাকা দিতে হবে ।
-ধুর **, ইয়ার্কি করিস না ।
-এখন ওই বারো টাকা চাইছি । এর পরে রেট হবে কুড়ি টাকা ।
কেপ্পন অথচ বুদ্ধিমান ক্যাশিয়ার রাজি হ'ল । চারজনকে ভ্যানে চড়িয়ে চললাম স্কুলবাজারে, প্রতিমা আনতে। ফিরে এসেই হাতে পেলাম কড়কড়ে বারো টাকা । জীবনের প্রথম উপার্জন ! কে বলে যে লক্ষ্মী আর সরস্বতীতে বনাবনি নেই ! পাঁচ-সাত জন মিলে সেই সন্ধ্যেতে কিংকরের দোকানে গুছিয়ে চা !
তখন আগের দিন বেশী রাত অবধি প্যান্ডেল বানানো আর সাজানো চলত । তারই মধ্যে কারও কারও 'লুকিয়ে খাওয়া প্রথম সিগারেট' ! আবার পরের দিন অন্ধকার থাকতেই উঠে পড়া । বরাবরই রোগা-পটকা ছিলাম। সেই সুযোগে এর-ওর বাড়ির পাঁচিল বা বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ফুল তুলে আনায় আমার জুড়ি ছিল না যে । চুরি ? যাহ, পূজোর কাজে ফুল নিলে তাকে চুরি করা বলে বুঝি !
ওই রিকশা টানার বছরেই, পূজোর আগের রাতে মাথায় এল, জলিদের বাড়ির গাছ থেকে ডাব পাড়া হবে। দায়িত্ব পড়ল আমার আর বাপীর ওপর। প্রায় প্রতি বিকেলে ওদের বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করতাম, তাই ওখানকার জিওগ্রাফি জানাই ছিল । তবু, অপারেশন ব'লে কথা ! তাই পূজোর আগের দিন বিকেলে দস্তুরমতো 'রেকি'-ও করা হ'ল ।
ঠিক হ'ল, রাস্তায় কয়েকটা ইঁট সাজিয়ে তার ওপর দাঁড়িয়ে তবেই অত উঁচু পাঁচিল পেরোনো যাবে । প্ল্যান মোতাবেক প্রথমে আমি ঢুকলাম, তার পরে বাপী । বাকিরা পাঁচিলের ওপারে, রাস্তায় । তরতরিয়ে গাছে উঠেই বাপী ডাব ফেলতে শুরু করলো । ও ডাব ফেলছে, আমি ক্যাচ ধরছি, আর বাইরে থাকা মালেদের দিয়ে দিচ্ছি । অপারেশন সাকসেসফুল।
মানে, প্রায় সাকসেসফুল ! একটা ডাব বাপী দূরে ফেললো, আমি ধরতে পারলাম না । আওয়াজ হ'ল, ধুপ্পাস ! বিপদ বুঝে আমি, ভায়া পেয়ারা গাছ, পাঁচিল টপকে রাস্তায় । মাটি ফুঁড়ে জলির বাবা এসে দাঁড়ালো । মাটিতে পড়ে থাকা ডাব দেখে ভেবে নিলো যে একটা ডাব এমনি এমনিই পড়ে গেছে হয়তো । যেই না বাড়ির দিকে টার্ণ করেছে, অমনি আবার 'ধুপ্পাস' !
তবে এবারের আওয়াজটা একটু গম্ভীর গোছের । এবার আর ডাব নয়, বাপী পড়েছে ! এক্কেবারে কাকুর পায়ের সামনেটাতে । হতভম্ব মানুষটা কিছু বোঝার আগেই বাপী পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম ক'রে বললো,
'শুভ বিজয়া'।
ব'লেই আবার পাঁচিল টপকে রাস্তার এপারে । তখন মেডিক্যাল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়া আমাদের তিন বন্ধুর প্রথম পেশেন্ট ছিল বাপীই !
তারও আগের কথা, তখন থাকি কাঁথিতে । এইটে পড়ি। আমাদের বাড়ির পাশেই, পাড়ার মাঠে প্যান্ডেল । যথারীতি, আমরাই বানাবো। রাত দেড়টা নাগাদ প্যান্ডেল বানানো শেষ। তাই পেছনের তাঁবুতে কম্বল-টম্বল জড়িয়ে শুয়ে খড়ের বিছানায় শুয়ে পড়লাম। হঠাৎ ফিল করলাম, খুব ঠান্ডা লাগছে। কম্বল, খড়ের বিছানা, সব কেমন যেন ভেজা-ভেজা ! স্বপ্ন দেখছি নির্ঘাৎ !
সেই আধো ঘুমেই শুনছি, কাকিমা, মানে উত্তমের মা ডুকরে কাঁদছে । সেকি রে বাবা ! আমার স্বপ্নে এসে কাকিমা কাঁদবে কেন ? বুঝলাম একটু পরে, সবার বাবা-মায়ের গলা পেয়ে । উঠতে গিয়ে দেখি আমাদের বুকের ওপর তাঁবুর বাঁশ পড়ে আছে, হাতে পায়ে জড়িয়ে আছে ইলেকট্রিকের তার । আমরা ঘুমোনোর পরেই নাকি তুমুল ঝড় এসেছিল । আশপাশে প্রচুর গাছপালাও পড়ে গেছে, তাঁবু তো কোন ছার ! চোদ্দ-পনেরো বছরের আমাদের ওই ছোট ছোট শরীরগুলো সারাদিনের পরিশ্রমের ধকলে এতটাই ক্লান্ত ছিল যে আমরা কিছুই বুঝিনি । ঝড় সামান্য কমতেই সবার বাবা মা দৌড়ে এসে ডাকাডাকি করেছে । কিন্তু আমাদের সাড়া না পেয়ে, তাঁবুর ওই দশা দেখে ধরেই নিয়েছিল যে তাঁবুর চাপে না হলেও ইলেকট্রিক শক খেয়ে আমরা পটলডাঙার টিকিট কেটে ফেলেছি । আসলে সেদিন ওই ঝড়বৃষ্টির শুরুতেই কারেন্ট অফ না হ'লে............ একটা ভাল ব্যাপার অবশ্য হ'ত, এই লেখা পড়ার কষ্ট করতে হ'ত না।
ওই ফার্স্ট ইয়ারের পূজোতেই......সেদিন হোস্টেলে ফিরছি । তখনো বিসর্জন হয় নি । যারা হোস্টেলে থাকতো না, তারাই সে ব্যাবস্থা করবে । বাড়ি থেকে খানিক আগে বেরিয়ে ব্যাগ কাঁধে সোজা প্যান্ডেলে । একটু পরেই ভার্গব এলো ব্র্যান্ড নিউ সাদা রঙের এলএমএল ভেস্পা নিয়ে । আমি মনে মনে খুশিই হলাম, অন্ততঃ স্টেশন পৌঁছোনোর আর চাপ নেই । টুটলা চালাতে চাইতেই সে ব্যাটা এক কথায় চাবিটা দিয়েও দিল। টুটলার দয়ার শরীর । আমাকে আর বাপীকে তাতে বসিয়ে স্টার্ট দিল । তারপরে, ক্লাচ ছাড়তেই ভেস্পা মশাই সামনের চাকা তুলে ফুট দশেক এগিয়ে তারপর চিত হয়ে পড়ল । ভার্গবের চোখের সামনেই ! কোনোরকমে উঠে দাঁড়িয়ে হাতে পায়ের চোটগুলো দেখছি, ভার্গবের আর্তনাদ শুনতে পেলাম......."বাবা অনেকবার স্কুটার আনতে বারণ করেছিল, আজ আর আস্ত রাখবে না" ।
টুটলা অম্লানবদনে জানালো, 'আমি তো আজই প্রথম স্কুটারে হাত দিলাম' ।
ভার্গবকে চেপে ধরলাম, 'টুটলাকে চালাতে দিলি কেন? '
ওর একটাই চিন্তা, "বাবা আস্ত রাখবে না"
বব্ধুকে "আস্ত" রাখার তাগিদে হোস্টেলের মাসের খরচ থেকে শুধু ফেরার খরচটুকু রেখে বাকিটা ভার্গবের "ভেস্পা রিপেয়ার তহবিল"-এ জমা দিয়ে চললাম হোস্টেলের দিকে । হাড়কেপ্পন ক্যাশিয়ার ওই বারো টাকা খরচের জন্য এত অভিশাপ দেবে কে জানতো !
এইসব ঘটনাগুলো ঘুরে ফিরে চলতো । একেক বার একেক রকম । কিন্তু পূজোর দিনে যা হ'ত, তার হেরফের হ'ত না মোটেও ! সেদিনই আসল ম্যাজিকটা হ'ত ।
সারা বছর ওরা ছিল নেহাৎই খেলার সাথী । কিন্তু সরস্বতী পূজোর সকালে হলুদ শাড়ীতে ওদের মধ্যে কেউ কেউ কেমন যেন অন্যরকম হয়ে উঠত । ঠিক আগের দিন বিকেলে যার সঙ্গে খেলা নিয়ে তুমুল ঝগড়া হ'ল, সরস্বতী পূজোর দিনে সে একবার ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখলে জীবন ধন্য হয়ে যেত । কিন্তু ঘাড় আর ঘুরতো কোথায় ! হলুদ শাড়ীদের নজর বীরদের দিকে । যে ফুটবলে বেশী গোল করে, যে ক্রিকেটে বেশী রান করে নিদেনপক্ষে যার একটা ঝাঁ চকচকে সাইকেল আছে..........
আচ্ছা, তাদের অন্তত: এই দিনটায় শরীর খারাপ তো হ'তে পারত !
যে ছেলেটা আগের বিকেলেই অমন দুরন্ত একটা ক্যাচ ধরল, কিছুদিন আগেই নেপালি-পাড়ার সঙ্গে ফুটবল ম্যাচে একটা 'প্লান্টিক'-সমেত তিনটে 'শিওর গোল' বাঁচালো, তার কপালে শুধুই উপেক্ষা !
বিশেষজ্ঞ(!) সুহৃদের পরামর্শ হ'ল মনের কথা মনে রাখলে চলবে না, সংশ্লিষ্ট 'হলুদ শাড়ী' কে বলতে হবে.........চিঠিও চলতে পারে ।
আচ্ছা, এই যে আমি সকালবেলা একমনে পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম, সেটা তো ও দেখতেই পেল । তা-ও, বলতে হবে !
বুচুর শাড়ীর আঁচল যখন গোলাপের কাঁটায় আটকে গেল, ও তো দেখল, যে নিজের পায়ে কাঁটা ফুঁটলে যেমনভাবে বার করি তার চেয়ে অনেক বেশী যত্ন ক'রে ওর শাড়ীটা ছাড়িয়ে আনলাম যাতে ও মায়ের কাছে বকুনি না খায় । এর পরেও, বলতে হবে !
সরস্বতী পূজোর দিনে নিজের পাড়াকে একরাশ শূন্যতায় ডুবিয়ে ওর মাসীর বাড়ী, মানে আমাদের পাড়ায় বেড়াতে আসা মেয়েটা কি কোনোভাবেই আমার মুগ্ধতা বোঝে নি ?
ওকেও, 'বলতে হবে' !
বলা হয় নি ।
বললে কী হ'ত তাও জানা নেই ।
আজকের সময় হ'লে কেমন একটা কার্ড দিয়েই বলা হয়ে যেত । ভাগ্যিস তখন ভ্যালেন্টাইন'স ডে আর আর্চি'স গ্যালারি ছিল না । তাই আজ এতগুলো বছর পরেও, ভাবতে বসেছি, কিভাবে বলতে পারতাম !
নাকি তখনই ঠিক ভেবেছিলাম ?
"বলিনি কখনও ?
আমি তো ভেবেছি, বলা হয়ে গেছে কবে !"
(অনেকদিন পরে পূজোর কাজে লাগতে পারার নস্টালজিয়া........তাই পুরোনো একটা লেখার সাথে নতুন কিছু জুড়ে একটা লাবড়া মতো বস্তু বানালাম । সরস্বতী পূজোর খিচুড়ির অনিবার্য অনুষঙ্গ)
#সঞ্জিত
Comments
Post a Comment