খবরা-খাবার
বেড়াতে গিয়ে অনেকের কেমন মজার মজার ঘটনা ঘটে ! তাঁরা সুন্দর ক'রে গল্পও বলেন । আমার কাছে তেমন গল্প নেই । আমি বরং ছোট ছোট তিনটে খাওয়ার গল্প করি ।
১)
তিনটে পরিবার সিমলা-কুলু-মানালি গেছিলাম । দিল্লি থেকে একটা টেম্পো ট্র্যাভেলার ভাড়া ক'রে । সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার পথে সবার কৌতুহল হল, ট্রাউট মাছ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে কিনা ! ড্রাইভার মন্নুকে জিজ্ঞেস করলাম,
-মানালি মেঁ ফিশ মিলেগা ?
-হাঁ সাব, কালাবাউস হ্যায় না ?
আমরা ভুবনেশ্বর থেকে গেছি । ওখানে কালবৌশ মাছকে কালাবাউস বলে । ভারতের মহান বৈচিত্রের মধ্যেও এমন ভাষাগত মিল দেখে আমরা মুগ্ধ । আর কালবৌশ মাছ ভাজা দিয়ে বিয়ার খাওয়া যাবে ভেবে আমি তো তখন সপ্তম স্বর্গে !
মানালি যখন পৌঁছোলাম তখন বেলা তিনটে । কালবৌশ খাওয়া হবে, তাই বড়রা লাঞ্চ করে নি । ড্রাইভার একটি বড়সড় হোটেলে গাড়ি ঢোকালো । সেখানে দামী দামী রেস্তোরাঁ আর ঝাঁ চকচকে দোকানের সারি । এখানে মাছের হেব্বি দাম হবে, বোঝা গেল । তবুও, কালবৌশ বলে কথা ! মন্নুকে বললাম,
-কালাবাউশ কাহাঁ মিলেগা ?
-ইয়ে হী তো কালাবাউশ হ্যায় ।
ওর দেখানো আঙুল ফলো ক'রে দেখলাম, বিল্ডিংএর ওপরে বড় বড় করে লেখা আছে,
"ক্লাবহাউস"
২)
সেবার পুরীতে যে হোটেলে উঠেছি, তার বেয়ারা কালিচরণ । খাবার অর্ডার নিতে রুমে এলো । আমি গুছিয়ে খাবারের অর্ডার দিতে পারি, এমন বদনাম আছে । তাই সব বেড়ানোতেই এই দায়িত্ব আমার কাঁধে থাকে । কালিচরণকে শুধোলাম,
-এক প্লেট আলুভাজা নিলে দুজনের হবে তো ? অনেকটা থাকে তো?
-হ্যাঁ স্যার, অনেকটা আলুভাজা থাকে ।
তাই দুজনের এক প্লেটই অর্ডার হ'ল । খেতে গিয়ে দেখি, একটা প্লেটের ওপর সরু সরু ঝিরিঝিরি আলুভাজা রাখা । তারা সংখ্যায় কিছুতেই কুড়িটার বেশি হবে না । কালিচরণকে বললাম,
-আরে কালিবাবু, এতোটা আলুভাজা কেউ দেয় ? এত খাওয়া যায় ?
কিন্তু কালি ব্যাটা লোক চড়িয়ে খায় । ধুরন্ধর । আমাদের মুখ দেখে আসল কথাটা বুঝেছিল । বললো,
-আর এক প্লেট এনে দেবো, স্যার ?
-আরও দু প্লেট নিয়ে এসো ।
সেই ট্রিপে যতবার ওর সাথে দেখা হয়েছে, 'জয় শ্রীরাম' বা 'জয় হিন্দ' বলার মতো করেই ওকে বলেছি, "এতটা আলুভাজা কেউ দেয় ? "। শুধু চেক আউটের সময় কালি নিজেই বলেছিলো,
-"পরের বার এলে আরও বেশি আলুভাজা দেবো" ।
৩)
এটা ঠিক বেড়ানোর গল্প নয় । আমি শিলিগুড়িতে যে গেস্ট হাউসে থাকতাম, সেখানকার গল্প ।
কেয়ারটেকার তামাং দাজু ভালো মানুষ । কিন্তু তার হাতে আলু পরোটা, খিচুড়ি বা দেশি মুরগি ছাড়া আর কোনো রান্নাই মুখে দেওয়া যায় না । তাই ওগুলো ছাড়া সব রান্না আমি নিজেই করতাম । চাল-ডাল-সবজি কিনে আনা, কেটেকুটে দেওয়া, ধোয়া, এইসব কাজ ও-ই করতো । তার বিনিময়ে মাসে কিছু টাকা দিতাম, অ্যান অ্যামাউন্ট মিউচুয়্যালি এগ্রিড আপন ।
তো, সেবার আমার বউ-ছেলে শীতের ছুটিতে এসে ফিরে গেছে । জানুয়ারির ২ তারিখ । মনটা খারাপ । কোনো ভাবে ডিমের ঝোল আর ভাত রেঁধে রেখে নিজের রুমে গিয়ে টিভি দেখলাম । খিদে পেতে ডাইনিং হল-এর কাছে এসে তামাংকে ডাকলাম । লঙ্কা, পেঁয়াজ তো ওই দেবে ! কিন্তু তার সাড়া নেই । খানিক অপেক্ষা ক'রে ওর রুমে ঢুকে দেখি ব্যাটা অঘোরে ঘুমোচ্ছে । মাঝে একবার জড়ানো গলায় বললো,
-"খানা লাগা দিয়া, সাবজী" ।
বুঝলাম, ওর নিউ ইয়ার চলছে । তাই নিজেই খাবার নিয়ে নেবো ভাবলাম ।
ডাইনিং হলে গিয়ে দেখি জনার্দন বসে আছে । ও ক্ল্যারিক্যাল স্টাফ, আমাদের গ্যাংটক অফিসের । ওর থালা আলো করে আছে আমার নিজের হাতে রান্না করা বাঁশকাঠি চালের ভাত আর ডিমের ডালনা ! আমাকে দেখেই শশব্যস্ত জনার্দন বললো,
-তামাং দাজু তো মুঝে খানা দেকর সো গয়া । আপকা খানা দে দুঁ, স্যার ? আজ খানা বড়িয়া বনা হ্যায় ।
-নহী । ম্যাঁয় তো ইয়ুঁহী আ গয়া থা.......
তামাং, না জনার্দন, কাকে বেশি গালাগালি দেবো ভাবতে ভাবতে নিজের রুমে ফিরে গেলাম । যখন আমি তামাংএর রান্না খেতাম, ও আনন্দ ক'রে আউট হয়ে যাওয়ায় আমার খাওয়া জোটে নি, এমন আপদ আগেও হয়েছে । তাই তৈরি থাকতাম । রুমে বিস্কুট আর মুড়ি রাখাই থাকতো ।
তামাংএর ঘুম পুরোপুরি ভেঙেছিল ৪ তারিখ । খাবার না পাওয়ার থেকেও বেশি দুঃখ হয়েছিলো স্বপাক ডিমের ডালনা হাতছাড়া হওয়ায় ।
তাই বকাঝকার পরিমান বেশিই হয়েছিলো হয়তো । দিন দুয়েক তামাং দাজু মুখ ভার ক'রে ছিলো । আমাকে দেখলেই বিড়বিড় করে বলছিলো,
-নয়া সাল উপলক্ষশ মেঁ থোড়াসা পী লিয়া ইসলিয়ে পুউউরাআআ দিন, কিসির কিসির করতা হ্যায়......
শেষে, একবার জড়িয়ে ধরে, "ও তামাং দাজু, মো তিমিলাই মায়া গর্সু" বলতেই, শিশুর মতো হেসে গলে গেলো সহজ, সরল, পাহাড়ি মানুষটা !
Comments
Post a Comment