আমি পাই না ছুঁতে তোমায়

অনেকদিন আগের কথা । ২০০২-এর ২রা ডিসেম্বর । ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি । মোবাইলে পিঁক ক'রে আওয়াজ হ'ল । এসএমএস । দেখলাম অভিজিতের মেসেজ । হুড়মুড়িয়ে মেসেজ খুললাম । একটা শব্দের ছোট্ট একটা মেসেজ । "Girl." চায়ের ভাঁড় ফেলে দুদ্দাড় ক'রে দৌড়োলাম অভিজিতের সাথে দেখা করতে । 

সেদিন আমরিতে আমরা অনেকে গেছিলাম। বন্দনার ডেলিভারি । মাঝে চা-সিগারেটের জন্য বাইরে গেছিলাম । তার মাঝেই খবরটা পেয়ে বন্দনার হাজব্যান্ড অভিজিৎ আমাদের জানিয়েছে, ওদের মেয়ে হয়েছে । আমার ছেলের বয়স তখন দু' দিন । তাই ওদের খুশির সাথে বেশ রিলেট করতে পারছিলাম। 

তারপরে সেই মেয়ের, মানে মিলির, যখন তিন-চার বছর বয়স, তখনও মাঝে মাঝে ওকে দেখার পরে সেই মেসেজটা দেখতাম । গার্ল ! একটা মেসেজে শুধু তো মেয়ে হওয়ার খবর নয়, অভিজিতের প্রথম বাবা হওয়ার খুশিটাও এসেছিল । আমার খুব প্রিয় মেসেজ । তাই ওই মেসেজটা আমার সিমকার্ডে সেভ করা ছিলো । তারপর একদিন সিমে কি একটা গোলমাল হ'তে ওটা পাল্টাতে হ'ল । যে মেসেজটা হারিয়ে ফেলার জন্য আমার মন খারাপ হ'ল সবচেয়ে বেশি, সেটা ছিল ওই মেসেজটাই । গার্ল ! 

কেজো মেসেজ বা জন্মদিন, দুর্গাপূজা ইত্যাদিতে শুভেচ্ছা জানানোর মেসেজগুলোর কথা বাদ দিচ্ছি । ওগুলো তো এক একটা কর্তব্য-পালন । সেগুলো ছাড়া, একেকটা মেসেজ এক এক রকম কথা মনে করায় । 

সেটা ২০১২-র মে মাস । সেবার আমার পুত্রের স্কুলের অ্যানুয়াল ডে সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে । ফোন সাইলেন্ট করা ছিল । ব্রেকের সময় বাইরে এসে দেখলাম একটা নাম্বার থেকে অনেকগুলো মিসড কল আর একটা এসএমএস । আগে মেসেজটাই দেখলাম । ছোট্ট মেসেজ । "Baba Swapnil here. Texting from one didi's mobile. Collect me from the mini theatre hall pls" । ওই নাম্বারে ফোন করতেই তিনি ফোন ধরলেন । জানা গেল, স্কুলের এক দিদির ফোন থেকে অনেকবার ট্রাই করেছে । আমি ফোন না ধরায় ওর মনে হয়েছে আননোন নাম্বার দেখে আমি ফোন ধরি নি । কিন্তু ওটা আমার ফোনে চিরদিন থেকে যাওয়ার মতো মেসেজ । হবে না ? আমার ছেলের করা প্রথম মেসেজ যে ! 

আমি এমনই । ইমোশনাল । মাঝে মাঝেই 'সেন্ট মেসেজ' আর 'ইনবক্স' ঘেঁটে পুরনো মেসেজ পড়ি ।  কখনো হাসি পায়, কখনো গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে ওঠে । একেকটা মেসেজের একেক রকম গল্প । আবার আজকের দিনে তার অন্য একটা মানে ! 

সেবার ২০০৮-এর গোড়ায় যখন কলকাতা ছেড়ে ভুবনেশ্বর চলে যাচ্ছি, হাওড়া স্টেশন থেকে এক বন্ধুকে মেসেজ পাঠিয়েছিলাম, যার মানে ছিল মোটামুটি এইরকম, "জীবন কী অদ্ভুত !  আজ একসাথে হাসার দিনগুলোকে মনে পড়ছে, আর একাই কাঁদছি ।" সেই বন্ধু বলেছিল, কয়েকটা বছর তো, দেখতে দেখতে কেটে যাবে । তারপর যখন ফিরলাম, দেখলাম আমাদের সেই বন্ধুত্বের তাল কেটেছে । তাই আজ আবার ওই "একলা কাঁদা"-র মেসেজ পড়ে হাসি পায় ।  

তারও আগে ভুবনেশ্বরেই একটা মেসেজ পেয়েছিলাম । তখন ওখানে একা থাকি আর দু সপ্তাহ বাদে একবার ক'রে বাড়ি আসি । মহালয়ার আগের সন্ধ্যায় আমার এক বন্ধুপত্নীর মেসেজ পেলাম । চারদিকে পূজো পূজো ভাব, অথচ আমি কলকাতায় নেই, তাই তাঁর মন খারাপ ! আমার বেশ কিছু বন্ধুপত্নী এবং মহিলা বন্ধু আমাকে মিস করছিলো, জানি । কারণ আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম । তবে এই মেসেজ ঠিক তেমন মিস করার কথা বলে নি । এতে ভাষাটা যেন কেমন একটা ছিলো । তাই উত্তর দিই নি । বাড়িতে ফিরে গিন্নীকে জানিয়ে ডিলিট ক'রে দিলাম । একটা এত সুন্দর সম্পর্ক........ এক মেসেজেই শেষ ! 

আর ওই মেসেজটা ! আমার এক আত্মীয় আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল । বলেছিলাম, 'যাবো একদিন' । তারপরে নানা কারণে যাওয়া হয় নি। অভিমান ক'রে আমার সেই আত্মীয় আমাকে একটা মেসেজ পাঠায় । আর তার পরে, হঠাৎ করেই সে, 'আত্মীয়' থেকে 'আত্মীয় ছিল' হয়ে গেল। সন্ধ্যেবেলায় সেলুনে চুল কাটানোর সময় খবর পেয়ে দৌড়ে গেলাম । শান্তির ঘুমে ডুবে থাকা মানুষটাকে দেখার পরে "ইনবক্স" খুললাম ।  আমার ইনবক্সে থেকে যাওয়া মেসেজটা আমাকে আজও মনে করায়, "u told me that u’ll come to my place once"........। ভাবার চেষ্টা করি, সেদিন গেলে কী কথা হ'ত । 

সেই আশির দশকের শেষদিকে টিভিতে একটা হিন্দি উইকলি অনুষ্ঠান হ'ত । তখনও সিরিয়াল বা ডেইলি সোপ আসে নি । মারাঠি নাটকের নামকরা সব অভিনেতারা ছিলেন । গল্পটা ছিল এক রিটায়ার্ড ডাকপিওনের । কর্তব্যনিষ্ঠ মানুষটা হঠাৎ ক'রে নিজের বাড়িতে বছর পঁচিশ আগের একবস্তা চিঠি খুঁজে পান । কিভাবে যেন সেই এক বস্তা চিঠি প্রাপকের কাছে যায় নি । কর্তব্যপরায়ণ রিটায়ার্ড ডাকপিওন ঠিক করেন সেই চিঠিগুলোই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেবেন । তার পরের তেরোটা পর্বে তেরোটা ঠিকানায় সেই চিঠি পৌঁছোনোর গল্প । পঁচিশ বছরের ব্যবধানে পাওয়া চিঠি একেকটা পরিবারে কী প্রতিক্রিয়া পেলো, তারই গল্প । সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা ! (কারও মনে থাকলে অনুষ্ঠানের নামটা জানাবেন, প্লিজ.........তিন অক্ষরের একটা নাম, সম্ভবত 'ল' দিয়ে শুরু) । পুরনো চিঠি, পুরনো মেসেজ, কথা, এইসব নিয়ে ঘাঁটার শুরু সেই থেকেই । 

আমি ইমোশনাল । শেষবার বাড়ি বদলের সময় যে পুরনো জিনিসগুলো বাতিল করা হ'ল, তাদের জন্যও আমার মন খারাপ হয় । তবু, ফোন পাল্টাতেই হয় । চেষ্টা করি, কন্ট্যাক্ট  আর মেসেজগুলো রেখে দিতে । 

এমনভাবেই মেসেজ আর কন্ট্যাক্ট লিস্ট হাসায়, ভাবায়, মন খারাপ ক'রে দেয় ।  এই যেমন, বছর তিনেক আগে এক কোলিগ এসে ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে বললেন, "ভালো আছো ? তোমার ফোন নাম্বারটা দাও তো......" । যারা এমনভাবে আন্তরিক গলায় নাম্বার চায়, তাঁদের কখনো বলা যায়, "আপনার নাম আমার মনে নেই" ? তাই আমার নাম্বার দিয়ে বললাম, "আমাকে একটা মিসড কল দিলেই সেভ ক'রে নেবো' । আপনি-তুমি-তুই এর চাপ নেই । প্যাসিভ ভয়েস জিন্দাবাদ !  নাম্বার তো পেলাম, কিন্তু সেভ করবো কী নামে ? ভাবলাম পরে কারো কাছে নামটা জেনে নেবো । কিন্তু সেই " পরে" এখনও হয় নি । তাই আজও আমার কন্ট্যাক্ট লিস্টে তার নাম, "ফরগট নেম"। ফোনে লাস্ট কথাবার্তা প্যাসিভেই হয়েছিল । 

মাঝে মাঝে কন্ট্যাক্ট লিস্টের নামগুলো দেখি আর ভাবি কার সাথে শেষবার ফোনে কী কথা হয়েছে । আর এই লিস্ট দেখতে দেখতেই পেয়ে যাই গুরুপদদার নাম । আমাদের খড়্গপুরের পাড়ার ছেলে । খানিকটা সিনিয়র । মোটর ভেহিকল ডিপার্টমেন্টের যে কোনো প্রবলেমে আমাদের রেডিমেড সল্যিউশন !  সবসময় টিপটপ । জামা গুঁজে পরা, পায়ে চকচকে জুতো, স্কুটারটা এত পরিস্কার, যে দেখলে মনে হয় এই সেদিন কেনা ! হাতে দামী সিগারেট । দেখা মাত্রই একটা সিগারেট বাড়িয়ে দেওয়ার অভ্যেস ! শেষবার হওয়া কথা অনুযায়ী আমাদের একসাথে পুরী যাওয়ার কথা । অমন পরিপাটি মানুষ গুরুপদদা খগপুরের রেলওয়ে ইয়ার্ডে মালগাড়ির চাকার তলায় দলা পাকিয়ে গেছিল, সেও তো বছর দশেক হ'ল ! ভুবনেশ্বরে আমার বাড়িতে এসে পুরী যাওয়ার কথা তাই ওর *****58861 নাম্বারেই আটকে পড়ে থাকলো । 

******4929 নাম্বারটা যাঁর, তিনি আমার কোলিগ । আক্ষরিক অর্থে শিলিগুড়িতে উনি আমার সাবঅর্ডিনেট ছিলেন, কিন্তু আমি "দাদা" ডাকতাম । ওঁর সাথে পূর্বপরিচয় ও সুসম্পর্কের খাতিরেই । আমার এক বছরের শিলিগুড়িবাসের সময়ে আমার যে কোনো সমস্যায় মুশকিল-আসান ! ওখান থেকে ফিরে আসার পরেও মাঝে মাঝে ফোন করতাম । এমনিই । তবে বেশিদিন করতে হয় নি । মাস তিনেকের মধ্যেই খবর পাই পুলকদা মারা গেছেন । আমার ও আরও অনেকের মুশকিল আসান পুলকদা নিজের মুশকিল আসান করার জন্য সহজ পথটাই বেছে নিয়েছিলেন । 

কাল রাতে আবার কন্ট্যাক্ট লিস্ট ঘাঁটছিলাম । রিটায়ারমেন্টের বছর দুয়েকের মধ্যেই একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে চলে যাওয়া লাহিড়িদার নাম্বারটাও আছে দেখলাম । জানি, এই নাম্বার থেকে কেউ কোনোদিন বলবে না, " কিরে ভাই, কেমন আছিস ?" । তবু, থাক না । মাঝে মাঝে মনে তো পড়বে ! 

নইলে দেবপ্রিয়, ইন্দ্রজিৎ, প্রণয় কুমার, বা এই সেদিন চলে যাওয়া সৌরভ কুমারদের মতো এদের নামগুলোও তো সেভাবে নিয়ম ক'রে মনে পড়তো না ! 

কেন কাল রাতে ইনবক্স দেখছিলাম !  একটা মেসেজ খুঁজছিলাম । মাঝে মাঝেই মেসেজ আসতো । "are you free ? can we talk ?"  বিনায়ক, ভন্ডটা, মাঝে মাঝেই মেসেজে লিখতো । আমার কোলিগ, আমার বন্ধু । আমার সাথে কথা বলার জন্য টাইম চাইতো । আবার এদিকে সপ্তমী বা অষ্টমীর সন্ধ্যায়, আমাদের দুজনের নিভৃত আসরে, নিজেরটা শেষ করার পরে আমার গ্লাস থেকে হুইস্কি খেয়ে নিতো চোঁ ক'রে । ভন্ড যে ! 

২০১৭-র মার্চে এসব নিয়েই ওর সাথে তুমুল ঝামেলা হ'ল । যাওয়া আসা বন্ধ । এপ্রিলের মাঝামাঝি বা শেষদিকে একদিন ফোন ক'রে বললো, "রাগ ক'রে থাকিস না রে । একদিন আয়" । বললাম, যাবো । বিনুকে বলা সেই "যাবো"-টা আর হয়ে উঠলো না । তারপর যেদিন যেতে পারলাম, সেদিন ছিলো মে মাসের সতেরো তারিখ । রাগ, অভিমান, ইগো, হিংসে, বিনয়, ভন্ডামি, সব পড়ে রইলো । আর বিনায়ক আমার কন্ট্যাক্ট লিস্টের একটা নাম্বার হয়ে থেকে গেল । 

বড্ড অনুতাপ হয়েছিল !  তাই সেদিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম । নিজেকে পাল্টানোর সিদ্ধান্ত । নতুনভাবে আর কোনো সম্পর্ককে আমার তরফ থেকে শেষ না ক'রে দেওয়ার সিদ্ধান্ত । আমার বয়স বাড়ছে, বয়স বাড়ছে আমার বন্ধুদেরও । আর কাউকে যেন মাঝরাতে মেসেজ আর কন্ট্যাক্ট লিস্টের দিকে তাকিয়ে কান্নার দলাটাকে গলার মধ্যে ঢুকিয়ে নিতে না হয় !

Comments