রাজাই শুধু নেই

২০০৯-এর অক্টোবরের শেষ থেকে ২০১০-এর মার্চের গোড়া অবধি প্রায় চার মাস রোজ অফিস করেছিলাম । মাঝে দুটো দিন বাদ দিলে, রোজ ! শনি-রোববার, বড়দিন, নিয়্যু ইয়ার, রোজ অফিস গেছিলাম। এমনকি, এক শনিবার দুপুরে পিকনিক সেরে বিকেলে অফিস গেছিলাম । একটা জরুরী আর বড়সড় কাজ ছিলো । 
মাঝে একদিন ছুটি নিয়েছিলাম, সেদিন পুত্রের জন্মদিন ছিলো । আর একটা দিন ছিলো ২০শে ফেব্রুয়ারি । শনিবার । বসকে আগাম বলতেই তিনি হেসে বললেন,

-নিশ্চয়ই খুব ইমোশন জড়ানো ব্যাপার হবে ? 

ঘটনাটা তার আগে । ওই পিকনিকের দিনেই । ভুবনেশ্বরে আমাদের বাঙালিদের একটা অর্গানাইজেশন ছিলো । প্রগতি । প্রগতির পিকনিকে আমি, অপু আর জয়ন্ত গানবাজনার তুমুল আসর বসিয়েছি । অপু আর জয়ন্ত ফাটিয়ে গাইছে, গামলা বাজাচ্ছি আমি ।  আর তাতে ঘুরে ফিরে আসছে মান্না দে'র গান । মারিকদা, আমাদের সেক্রেটারি এসে বললেন,

-সবাই দাদার খুব ভক্ত মনে হচ্ছে ! তাহলে এবার অ্যানুয়াল ফাংশানে দাদাকে আনি ? 

অন্য কেউ হ'লে ভাবতাম ঠাট্টা করছে । কিন্তু জানতাম, মারিকদা ইম্প্রেসারিও । এমন নামকরা শিল্পীদের নিয়ে উনি অনুষ্ঠান করান । সুতরাং, আমরা চেঁচিয়ে বললাম, 
-হোক ! হোক ! হোক ! 

দিন পনেরো পরেই কনফার্মেশন । "দাদা আসবেন বলেছেন" ! কিন্তু সমস্যা একটাই, দাদা যে আসবেন, সারাদিন ওনার দেখাশোনা করবেন কে ? 

আমি বরাবরই সেলেব্রিটিদের থেকে দূরে থাকতে ভালোবাসি । কিন্তু মান্না দে তো আমার কাছে ঠিক সেলেব্রিটি নন । আমার গান শুনতে শেখা, গান ভালোবাসতে শেখা, সব ওনার গান শুনে । মনে পড়লো, আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে বাসের মাথায় চড়ে পনেরো কিলোমিটার গেছিলাম "মান্না দে নাইট" দেখবো ব'লে । আমি মান্না দেকে দেখেছি, এতেই আমার গর্বের শেষ নেই । একটা গোটা দিন সেই মান্না দের সাথে ! হেঁকে উঠে বললাম, "আমি রাজী" ! 
আমার বস ঠিকই বুঝেছিলেন । খুব ইমোশন জড়ানো ব্যাপার । তাই ২০শে ফেব্রুয়ারি অফিস করবো না । 

সেই দিনটা এলো । বেলা এগারোটা নাগাদ কিংফিশারের ব্যাঙ্গালোর ফ্লাইট ল্যান্ড করার খানিক পরে তিনি এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলেন । মারিকদা আলাপ করালেন । আমি ওঁর পা ছুঁতেই মনে হ'ল,  "ধন্য আমি, ধন্য হে" ! 

এক গাড়িতে হোটেলে গেলাম । মারিকদার কাছে আগেই শুনেছিলাম, নিজের প্রাপ্য সান্মানিকের তুলনায় অনেক কম টাকাতেই তিনি ভুবনেশ্বরে গাইতে এসেছিলেন, শুধুমাত্র এইজন্য যে কিছু অন্ধ ভক্ত তাঁকে দেখতে চায়, তাঁর গান শুনতে চায় । হোটেলের রুমে গিয়ে একটা টেলিফোন খুঁজছিলেন, ব্যাঙ্গালোরের বাড়িতে স্ত্রীকে ফোন করবেন । আমি মোবাইল ফোনটা বাড়িয়ে দিতেই, অসীম কুন্ঠার সাথে বললেন,
-অনেক খরচ পড়বে তো ! 

কিপ্টেমি নয়, অন্যের উপকার সহজে না নিতে চাওয়ার ঋজুতা । কথায় কথায় বলছিলেন,
-মারিক বিজনেস ক্লাসের টিকিট দিতে চেয়েছিলো, নিই নি । তিনগুন ভাড়া, ভাবতে পারো ! 
পা-টা মাটিতে ঠেকিয়ে রাখা হয়তো একেই বলে । 

এবারে খোঁজ শুরু হ'ল হারমোনিয়ামের । সিনহাদার (নামটা ঠিক বলছি নিশ্চয়ই) স্কেলচেঞ্জিং হারমোনিয়াম এলো । তার টেস্টিং শুরু হ'ল । কিছুক্ষণ গানের সুর বাজাবার পরে, হয়তো যন্ত্র পছন্দ হওয়াতে, এবার গুনগুন ক'রে গাইতে শুরু করলেন । হোটেলের ঘরে, মান্না দে গাইছেন "আমি নিরালায় ব'সে" আর আমি, শুধু আমি তা শুনছি । "মুঠোয় ধরি দিনের সূর্য, তারার রাতটাকে" ! 

লাঞ্চ হ'ল । মারিকদা এলেন । সামান্য আড্ডা হ'ল,  আজকের প্রজন্মের গান নিয়ে কত কথাই বললেন ! নতুন ছেলেমেয়েদের প্রতি কি অসম্ভব শ্রদ্ধা ! তারপরে হ্যান্ডস এলো। সামান্য আলোচনা ক'রে নিলেন কী কী গান গাইবেন । আর সেই আলোচনার মাঝে আমাকেও থাকতে হ'ল, গান সিলেকশনে আমার রোল আছে যে ! একজন মানুষের মন এত উঁচুও হয় ! আরও খানিক পরে এলেন এক মহিলা শিল্পী । একা মান্না দের পক্ষে তিন ঘন্টার অনুষ্ঠান কষ্টকর হবে বলেই তাঁকে আনা । তিনি মান্না দের সাথে কয়েকটা ড্যুয়েট গানও গাইবেন । তাঁর সাথে গান সিলেক্ট করলেন, আর গানের স্কেল নিয়ে কথা বললেন । 

তারপরে এলো সন্ধ্যের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় । হলে ঢোকার সময় এক জায়গায় রাস্তা অসমান ছিলো । আমি ওঁর হাত ধরতেই খানিক হেসে হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন,
-নব্বই পেরিয়েছি, কিন্তু বুড়ো হই নি এখনও । 

তা হন নি, সেটা অনুষ্ঠান শুরু হতেই বোঝা গেলো । জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলী......গান শুরু হওয়া মাত্র হল স্তব্ধ ! ব্যালকনির সিটে বসে আমি, অপু আর জয়ন্ত একে অন্যের হাত চেপে ধরে বসে । তার পরের ঘন্টা দেড়েক, গান শুধু গান.........। 

বয়স অবশ্যই সুরে, কন্ঠে থাবা বসিয়েছে, কিন্তু আঠাশ বছর আগে লাইভে দেখা মান্না দে একটুও বুড়ো হন নি । সেই একই রকম মজলিশি মেজাজে গান গাওয়া । সুরের ঘোরে বুঁদ হয়ে ! কেউ শুরুতেই কোনো গানের জন্য অনুরোধ করলে, সেই সময়কার মতোই, 
-ফরমায়েশ তো বাদ মেঁ ভী কর সকতেঁ হ্যায়, পহলে গানে তো দিজিয়ে !  
"মেজাজটাই তো আসল রাজা....." । শ্রোতাদের মাঝে ওড়িয়া লোকজনও ছিলেন । তাঁরা ওড়িয়া গানের অনুরোধ করলেন । বিনয়ের সাথে উত্তর এলো, গাইবেন না । কারণ, তিনি "প্রিপেয়ার্ড" নন ! কী চুড়ান্ত প্রফেশনালিজম ! 

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার অনেক পরে, রাত সাড়ে দশটা নাগাদ হোটেলের একটা ফাঁকা হলে ডিনার শুরু হ'ল । ওঁর সাথে মারিকদা, রাজর্ষি আর আমি । মিতাহারী মানুষটি প্রায় কিছুই খেলেন না । তবু সারাক্ষণ আমাদের সঙ্গ দিলেন । বিশদে লিখলাম না । শুধু এইটুকু বলতে পারি, অমন সন্ধ্যে আমার জীবনে বড় একটা আসে নি ।  
 
উনি বেঁচে থাকলে আজ ঠিক একশো বছর বয়স হ'ত । তবে কাগজে ওঁর শেষ জীবনের যে ক্লেশের কথা পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে, চলে গিয়ে মুক্তি পেয়েছেন । কিছু কি আন্দাজ করেছিলেন ? নইলে কেন গাইবেন 

"ফুল নিয়ে আসতে যখন
ভুলে যাবে সব প্রিয়জন
ওই গাছটা তখন তার ফুল ঝরাবে
বেদীটা শিশির দিয়ে রাখবে ধুয়ে"

ওই গানেই বলেছেন,

"চিরকাল রাখবে মনে
এমন সময় কারো নেই"

আমার কৈশোর আর যৌবনে "গান" শব্দটাকে এত অর্থবহ করেছিলেন আপনি । ভবিষ্যতে স্মৃতিশক্তি বিশ্বাসঘাতকতা না করলে, আপনাকে ভুল প্রমান করবোই । 

শতবর্ষে প্রিয়তম শিল্পীকে এক গুনমুগ্ধ ভক্তের বিনম্র শ্রদ্ধা ।

Comments