বিলম্বিত ডায়েরি

শুরুর কথা 
*****************************
-আমরা আটজন, আর বার্থ মাত্র পাঁচটা ! 
অকাল বসন্তের বৃষ্টির চেয়েও ঘ্যানঘ্যানে সংশয়ের বৃষ্টি আমার অর্ধাঙ্গিনীর চোখেমুখে । 

হয়েছে কি, মাত্র দিন দশেক আগে জেনেছি যে ফেব্রুয়ার ২৬ তারিখ ছেলের পরীক্ষা শেষ আর তার পরে মার্চের তিন তারিখ অবধি স্কুল আর ট্যুইশনেরও ছুটি । ক্লাস ইলেভেনের পড়ার চাপে ওর দিন কয়েকের ছুটি দরকার, কোনো এক শনিবারের সন্ধ্যেবেলায় মেনেও নিয়েছিলাম । এমনিতেই তো সবাই জানে, বাড়িতে বাচ্চারা বসের মতো ব্যবহার করে আর অফিসে বসেরা বাচ্চার মতো। তার ওপর শনিবারের 'দুর্বল মুহুর্তে' নিজের মুখে স্বীকার গেছি সেকথা । আমাকে বাঁচায় সাধ্যি কার !

তার তিন-চার দিন পরে অফিসের সেই বাচ্চাটি, থুড়ি, বস আর কি, তাঁর সামনে দু হাত কচলে এক্কেবারে বিনয়ের অবতার হয়ে তিনদিন ছুটির কথা তুললাম। সঙ্গে শনি-রবি মিশিয়ে টানা পাঁচদিন হয়ে যায় ! 
'এ দেশে কেউ আর পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ চাইছে না', এমন খবরেও হয়তো তিনি এত অবাক হতেন না, যতটা আমার কথা শুনে ঘাবড়ে গেলেন ! বললেন,
-ইয়েস, ইউ ডেফিনিটলি নিড আ ব্রেক। মেক আ প্লান ফর ভেকেশন ইন এপ্রিল । 
-স্যার, ইউ নো......
-ফর দ্য হিলস, এপ্রিল ইজ দ্য বেস্ট টাইম, রাইট ?
মন্ত্রগুপ্তির শপথ আছে, তাই আর বিশদে বললাম না। কিন্তু, তারপর কোথা হইতে কী হইল, আমার ছুটি মঞ্জুর হইল । পরের দিন সাতেক রোজ রাত দশটায় বাড়ি ফিরেছি ! 

এরই মাঝে বেড়াতে যাওয়ার দলের কলেবর বেড়েছে। 'হাম দো, হামারা এক' তো ছিলামই, সঙ্গে এক বন্ধু পরিবার । তাদের সাথে তিনটে নদী, তিস্তা, রিম্বি আর নোঈ.........তিনজন খুদে খুদে 'তুতো বোন' !  আমাদের তিন থেকে ওরা পাঁচজন ।  আহ্লাদে আট-খানা হলাম, সবাই ! 

কিন্তু জার্নির ডেটের সাতদিন আগে 'পাহাড়ে যাবো' বাই উঠলে যা হয়, এনজেপি বাউন্ড সব ট্রেনেই ওয়েটিং লিস্ট ! সবার বস তো আমার বসের মতো সমঝদার নয় (এই অংশটুকু ওঁর কানে কেউ তুলে দিন না, প্লিজ.….....অ্যানুয়াল পারফরমেন্স অ্যাপ্রাইসালের সময় আসছে যে)। তাই ট্রেনের টিকিটের ডিমান্ড ছিল না মনে হয়। নইলে সাতদিন আগে টিকিট কেটে দার্জিলিং মেলে ওয়েটিং লিস্ট ২১ পাওয়া যায় ! তার ওপর আবার যাওয়ার দিনে "আটে পাঁচ" কনফার্ম ! বাকি তিনটি আরএসি । 

টিটিই সাহেব মানুষটি বেশ রসিক । ওঁর আর্ম ব্যান্ডে লেখা ছিল "ট্রেন ক্যাপ্টেন" । সেটা নিয়ে একটু পালটা রসিকতা করতেই দেখলাম আমাকেও তাঁর মনে ধরেছে। নিজের থেকে দায়িত্ব নিয়ে বাকি টিকিট কনফার্ম ক'রে দিলেন । তিনটেই লোয়ার বার্থ ! 

একটাই আফশোস থাকলো। কনফার্ম হবেই, সেটা আগে থেকে জানা থাকলে আমরাও বাড়ি থেকে লুচি আর আলুর নাইজেরিয়ান তরকারি (অনেকে সাদা তরকারিও বলেন, কিন্তু আমার পোর্শনে এত কাঁচালঙ্কা থাকে বলে আমার তরকারিটা নাইজেরিয়ান হয়ে যায়) আনতে পারতাম । যাঁরা আমার চোখের সামনে সপরিবারে ওসব খেলেন, অকারণে তাঁদের পেটে ব্যাথা হ'ত না । 

তারপরেই আমার চরম প্রিয় একটা কাজ । চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমে ঢলে পড়া । চালাও টেরেন.........এনজেপি !! 

ঘুম যখন ভাঙলো, বুঝলাম সদ্য কিষেনগঞ্জ পেরিয়েছি । ২০১৪-১৫ তে এক বছর শিলিগুড়িতে কাটিয়েছি । প্রায় প্রতি সোমবার সকালে ট্রেনের কোচে ঘুম ভাঙলেই কলকাতার বাড়িতে থাকা ছেলেটার কথা ভেবে আমাকে চেপে ধরতো একরাশ মনখারাপ। আজ বছর চারেক পরে সেই একই ট্রেনে, একইভাবে জেগে ওঠার পরে, মনে শুধুই খুশির রেশ। আলাদা আলাদা সময় আর পরিস্থিতি আমাদের এতটাও বদলে দেয় ! 

সেই শিলিগুড়িতে থাকার সময় যেখানে থাকতাম, আমাদের সেই গেস্ট হাউসেই ফ্রেশ হওয়া গেল। তারপর গরমাগরম আলু পরোটা আর ধনেপাতার ঝাল চাটনি ! তখনকার কুক তামাং দাজু এখন আর নেই, তার জায়গায় এসেছে গজরাজ বলে একটি ছেলে। এক্স সার্ভিসম্যান তামাং-এর মতো আলু পরোটা আর কেউ বানাতে পারবেই না। গজরাজ অবশ্য চাটনিটা খেলিয়ে বানিয়েছিল । টমাটো পুড়িয়ে সেটাকে গার্ডেন ফ্রেশ ধনেপাতা আর কাঁচালঙ্কার সাথে বেটে সেটাকে অল্প তেলে রেঁধে নেওয়া !  উফফফ। 
সবশেষে একটা ক'রে অমলেট ! কথা প্রসঙ্গে উঠে এলো সেই অমোঘ প্রশ্ন । অমলেট কেমন ক'রে মোটা বানাতে হয় । আলোচনা করতে করতেই গাড়িতে বসলাম । গাড়ি খাপ্রেল মোড় পেরোতেই  মনে মনে গুনগুন ক'রে উঠলাম,

মেঘ পিওনের ব্যাগের ভেতর 
মন খারাপের দিস্তা
মন খারাপ হ'লে কুয়াশা হয়,
ব্যাকুল হ'লে তিস্তা !! 

প্রথম থামা গাড়িধরায় । এখানে একসময় গোর্খাল্যান্ড মুক্তি মোর্চার খুব বড় বেস ছিল । আজও দেখলাম গোর্খা যুব মোর্চার পতাকা । তবে তার পাশাপাশি, তার চেয়েও বেশি অন্য একটা দলের পতাকা । সময় বদলে যায় ! এখানে আমরা জল, কেক বিস্কুট ইত্যাদি নিতে গেলাম একটা দোকানে । তখন সকাল সাড়ে এগারোটা। দেখলাম স্থানীয় দুটি ছেলে ধীরে ধীরে জলপুলিশের আওতায় যাচ্ছে, সাথে চিনেবাদাম ! বেড়াতে এসে কে আর লোকাল পুলিশের হাতে যেতে চায় ? আমিও ভাবলাম, জল পুলিশই ভাল । তারপরেই মনে হ'ল,  সুন্দরী দোকানীর মধুশালায় আমি রসিক হ'লে গিন্নি রাগ করবেন। বুকে বালাসন নদীর পাথর চেপে হাতে জলের ক্রেট ঝুলিয়ে ফিরে গেলাম গাড়িতে ।  
আর ঠিক তখনই, দিনের মধ্যে প্রথমবার, আকাশে রোদ উঠলো ঝলমলিয়ে ! 

গাড়িধরা থেকেই, বাঁয়ে মুড় ! এবার আমরা মিরিকের পথে। এটা অন্য রুট।  তাই দুধিয়া, বেংডুবি পড়ে রইল বাঁ দিকে। দুধিয়া বাজার পৌঁছোবার আগেই বাঁদিকে দেখলাম দুধিয়া ব্রিজ। ওই ব্রিজের ওপর ইমনের টি স্টল ! আমার এক বছরের শিলিগুড়ি জীবনের সবচেয়ে ভাল অভিজ্ঞতার মধ্যে একটা হ'ল এই ইমনের দোকানের ঝাল মুড়ি, ডিমের চপ আর কফি। আমার পুত্রেরও একই মত। সে ব্যাটা এবারও বার দুয়েক চেঁচালো, 
-"ওই যে ইমন দাদার দোকান" !! 

ড্রাইভার মনোজ খাদ্যরসিক নয় মোটেও। তার ওপর আমরা অলরেডি, মোর দ্যান ওয়ান আওয়ার বাহাইন্ড দ্য শিডিউল......... তাই, নো দুধিয়া ব্রিজ.....দুধিয়া বাজার হয়ে এবার মিরিকের দিকে। 

মিরিকের কাছাকাছি মানেই সবুজ চা বাগানের ঢল, এটাই তো জেনে এসেছি বরাবর !  কিন্তু এখন চা গাছের প্রুনিং এর সময়। বেশির ভাগ টি বুশেরই মাথা কাটা !  মেঘ পিওনের ব্যাগ রেডি। আর এ পথে তিস্তাও পাশে নেই । তাই শুধুই মন খারাপের দিস্তার সাথে এগোনো । 

মন ভাল হ'ল ফুগুড়ি টি এস্টেট আসতেই । আবার সেই সবজে গালিচা। তখন ৩৭০০ ফিট পেরিয়েছি। কাচ তোলা গাড়ির ভেতরেও ঠান্ডা মালুম হচ্ছে । হঠাৎ, মনটা ভাল হয়ে গেল ।  এই ঠান্ডাতেও, একটা বাইকে বসে,  পরস্পরের ওমে বুঁদ হওয়া কপোত-কপোতীকে দেখে । ওরা ভাল থাকুক ।  এ পৃথিবীর সর্বত্র, ভালবাসা ভাল থাকুক ! 

তারপর থেকে, পাহাড়ি রাস্তার সেই চেনা ছবি । আলস্য মেখে পড়ে আছে রাস্তা। তার দুপাশে অলস পাহাড়ি মানুষের জীবনের জলছবি ।  জলছবি, কারণ, বৃষ্টি আবার শুরু হয়ে গেছিল যে। রাস্তা জুড়ে আবার মেঘেদের আনাগোনা শুরু হ'ল। 

'এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে' । 

ফুগুড়ির পরে ছোট্ট গঞ্জের মতো যে জায়গায় খানিক ব্যস্ততার দেখা মিললো, তার নাম সৌরেনি ।  

মনোজ ফগলাইট জ্বালালো । তারপরে ওয়াইপারও! মিরিক ফরেস্ট রেস্ট হাউসের কাছাকাছি এসে ওয়েদার খানিক ভাল হ'ল । ঘড়িতে বেলা সাড়ে বারোটা । মিরিক এসে গেল । তারপর, পশুপতি মার্কেটকে বাঁদিকে রেখে, সিমানা !  

সুখিয়া আসার আগে আগে সিমানাতে ড্রাইভার মনোজ দাঁড়ালো চা খেতে । কনকনে ঠান্ডা আর বৃষ্টি জানান দিলো,পাহাড়ের ওয়েদার আর স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম একই রকম, দেবা না জানন্তি ! মুখ থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছিলো, সিগারেট না খেয়েও ।  সেই ছোট্টবেলার মতো  । মনোজের ওপর রাগ হচ্ছিল! সহযাত্রী রক্তিমা হঠাৎ বলে উঠলো, 

-"স্নো ফল" !! 

দৌড়ে গেলাম সবাই ! 
সিমানা থেকে বাঁ দিকে, মানে সন্দকফুর দিকে তাকাতেই দেখি, 

পাহাড়চুড়ায় বরফ !  

হঠাৎ এই ওয়েদার চেঞ্জের কারণ বোঝা গেল । 

সিমানার একটামাত্র দোকানে সারি সারি বিয়ারের ক্যান, তার ওপর পাহাড়চূড়ায় বরফ ! আমার চিরকালীন "দিনে হ্যাঁ নেই, রাতে না নেই" ঘোষণা ভুলে গিয়ে প্রায় কিনে ফেলেছিলাম আর কি ! কিন্তু আবারও, গিন্নির সন্দেহজাল ছেঁড়ার চেষ্টায় অমন অ্যাট্রাকটিভ দোকানীর থেকে কিনলাম শুধু ডালমুট আর কাঠিভাজা......লঙ্কা পেঁয়াজ ঠেসে । গিন্নির জন্য আলুর দম। গাড়ি চলতে শুরু করলো । 

সতীর খুশিতে পতির খুশি !  
তাই বুঝি রোদ উঠলো । গিন্নি মোবাইলে বাজালো.....
কস্তো মজা হ্যায় রেলাইমা ! 

মিনিট কয়েক সুখিয়াপোখরি এসে গেল । এখান থেকে ডানদিকে সোজা গেলেই চামং ! 
রিসর্টে কেউ আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে । আমাদের লাঞ্চ ! 

লাঞ্চ যখন শুরু হ'ল,  তখন তিনটে বেজে গেছে ! মাছে-ভাতে বাঙালি হওয়ার সাধ হ'ল । রিম্বি যেই মাছের একটা পিস ফর্ক দিয়ে বিঁধলো, দেখেই বুঝলাম, এটি নেহাতই বাসা, আমার ভালবাসার ভেটকি নয় ! (হুঁহুঁ, মাছের জাস্ট ফাইবার দেখে বলে দিতে পারি, ভেটকি, ভোলা নাকি বাসা) । তাই ভেজ মিল.......

খানিক রেস্ট ক'রে যেই না বাইরে বেরোবো, আবার বৃষ্টি এলো ঝমঝমিয়ে........

সন্ধ্যে নামছে ঝুপঝুপিয়ে, আমার ঘরের সামনে যে আড্ডা মারার জায়গাটা আছে, সেখান থেকে দেখছি সামনের দিকে, কিন্তু অনেক দূরে, মিরিকে, এক এক ক'রে জ্বলে উঠছে সন্ধ্যের আলো, বাঁদিকে এক চিলতে কার্শিয়ং......সেখানেও আলোর মালা সাজছে..... 

ইচ্ছে করছে, এখানেই থাকি । 

"ফিরতে ঘরে ভয়
ফিরলে ঘরে, দুঃখগুলোর
সঙ্গে দেখা হয়" 

বুঝতেই পারলাম, আজ বুধবার হলেও সর্বশক্তিমান চাইছেন আজ যেন আমার শনিবার হয় ! তাই অনিওন পকোড়া, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর বরফের অর্ডার দিয়ে দিলাম ! 

শনিবার কথাটা যাঁরা বুঝলেন না, তাঁদের জন্য আস্থা চ্যানেল আছে । 
যাঁরা বুঝলেন, তাঁদের জন্য বলি, 
লাইফ ইজ গুড ! 

ওহ, একটা কথা । ওই যে, ডিমের অমলেট কেমন ক'রে মোটা করতে হয় । 

শুনুন, ডিমের সাথে পেঁয়াজ, টমাটো, এসব না দিয়ে আর দু চারটে ডিম দিয়ে দিন...…....এই এত্তো মোটা একটা অমলেট হবে । 

জানেন তো, অমলেটে কাঁচালঙ্কা ছাড়া আর অন্য কিছু দিলে ডিমের কুসুম রাগ করে । 

নিন, আরও আদিখ্যেতা ক'রে বলুন, 

-তোমার কি মন নাই, "কুসুম" ??  

(২৭-০২-২০১৯)
******************************
পায়ে পায়ে পাহাড়ে.......
************************************************
আগের দিন বড্ড ধকল গেছিল । তার ওপর আবার অকাল শনিবার । তাই আমার অনিদ্রাকে ভুলিয়ে তাড়াতাড়িই, মানে রাত সাড়ে বারোটা-একটা নাগাদ ঘুম এসে গেছিল । তাই ঘুম ভাঙলোও তাড়াতাড়ি । কাচের জানালা দিয়ে দেখলাম, রোদ তেমন না উঠলেও, সকালের আলো ফুটেছে । হুড়মুড়িয়ে ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে এলাম । সকাল তখন সাড়ে ছ’টা । 
আমাকে দেখেই, হয়তো এত সকালে আমাকে দেখেই, আকাশ খুশি হ’ল । সেই খবর পেয়ে সূয্যি মামারও দিলখুশ ! সাতটা নাগাদ সকালের সোনালী রোদে চারদিক যখন ভেসে যাচ্ছে, আমার সঙ্গী অন্যরাও পায়ে পায়ে ঘর ছেড়ে বেরোলো । ঠিক হ’ল, পাহাড়ের চুড়োয় ওই যে ছোট্ট শিবমন্দির, আমরা ওইখানটাতে যাবো । আশেপাশে কোথাও যাওয়াই যেতো, কিন্তু পেটচুক্তির ব্রেকফাস্ট প্রাপ্য আছে যে, একটু ক্ষিধে না পেলে চলে ! 
ওখানে গিয়ে আলাপ হল রাজস্থানের মিঃ চৌধুরির সাথে । কমার্স গ্র্যাজুয়েট মানুষটি ওই টি এস্টেটের ম্যানেজার । কমার্স পড়ে এসে তিনি মাটির, মানুষের সাথে মিশে কাজ করছেন ! আর এগ্রিকালচার গ্র্যাজুয়েট এই আমি পেটের ভাত জোগাড় করছি অন্যের হিসেবের গরমিল খোঁজার কাজ ক’রে । 
কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায় ! 
তবে আকাশের রঙ্গ দেখা বাকি ছিল । আবার বর্ষা এলো ঝিমিঝিমিয়ে । আশপাশের বাড়িগুলোর টিনের ছাদে বৃষ্টির জলতরঙ্গ শুনেও মন ভাল হ’ল না । প্ল্যান ভেস্তে যাওয়ার জোগাড় যে ! 

সুখিয়া পোখরি, মানেভঞ্জন, ফালুট, সন্দকফু, তাঁবুতে রাত্রিবাস.........সেই “গর্ভধারিণী” পড়ার পরেই এসবের প্রেমে পড়েছিলাম । তার ওপর সম্প্রতি সব্যসাচীর ‘আশ্চর্য ভ্রমণ’ পড়ে আবার পুরোনো প্রেম চাগাড় দিয়ে উঠেছিল । তাই বাড়ি থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় প্ল্যান হয়েছিল সিংগালিলা রিজার্ভ ফরেস্টে ল্যান্ডরোভারে চেপে সাফারি করা হবে । আমার জঙ্গল-প্রেমী পুত্র এক কথায় রাজি । তার মাতৃদেবীও রাজি ছিলেন । অন্তত তেমনই পূর্বাভাস ছিল । কিন্তু ওই যে, গতকাল পশুপতি মার্কেটের পাশ দিয়ে আসার সময় হঠাৎ আবেগে ভেসে গিয়ে তাঁকে বলেছিলাম, 
‘জানো, কলেজে পরার সময় এখান থেকে কম দামে কত কিছু কিনেছিলাম  !’
ব্যাস, পাহাড়ে যেমন ওয়েদার পাল্টায়, তেমন করেই তাঁর প্রেফারেন্স পাল্টে গেল । সাপোর্টার হিসেবে তিনি পেয়ে গেলেন, কিশোরীর অভিমানের মত মেঘলা রঙ হয়ে থাকা আকাশকে । তাঁর সুস্পষ্ট ঘোষণা,
-এই বৃষ্টির মধ্যে ওখানে গিয়ে লাভ নেই, পশুপতিই যাবো । 
আমি বোঝালাম, দিন পাল্টেছে । আজকাল এই সব কিছু কলকাতাতেও পাওয়া যায় । 
আমি বুঝলাম, বোঝানোর চেষ্টা করাই ভুল ।
আমি বুঝলাম, এবার লাগবে, 
এবার আমায় ডুবতে হবে ।

“সুখের ঘরে প্রেমের বৃষ্টি ঝিমঝিমাইয়া পড়ে
একলা ঘরে ভালোবাসা কেঁদে কেঁদে মরে 
ডুবিয়া মরিলাম, 
মরিয়া ডুবিলাম !”

আমার সহায় হয়ে মামলার বিচার করতে এলো রক্তিমা আর পিঙ্কি, মানে আমাদের দুই সহযাত্রী । রায় ঘোষণা হ’ল, মানেভঞ্জন গিয়ে, পরিস্থিতি দেখে, তার পরে ফাইনাল ডিশিসন হবে । যুযুধান দুই পক্ষই মেনে নিল সেই অন্তর্বর্তীকালীন রায় । 
অবস্থা আয়ত্ত্বের মধ্যে আসতে আমার ক্ষিধে পেল, যেমন পায় । সেই পেটচুক্তি ব্রেকফাস্টের কথা মনে পড়লে যেমন হওয়ার কথা । তা খেলামও বটে ! ছোলে-বাটুরে, দোসা, অমলেট  । এখানকার রাঁধুনী আমার কালকের কথা শুনেছিল মনে হয় । অবিকল আমার স্বপ্নে দেখা মোটা মোটা, গোল্ডেন ব্রাউন অমলেট, মাঝে কাঁচালঙ্কার চুমকি ছড়ানো, এক্কেবারে ঘন ক’রে ! শেষে সেই বাগানেরই চায়ের পাতায় তৈরি লিকার চা ।
যখন রওয়ানা হলাম, ঘড়িতে ঠিক পৌনে দশটা । 
ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে । 
কনকনিয়ে ঠান্ডা পড়ছে !
পোখরিয়াবং থেকে বাঁদিকে যেতেই সুখিয়া পোখরি । এরা বলে সুখ্যেপোখরি । ওখান থেকে বাঁদিকে গেলে সেই রাস্তা, যেখান দিয়ে আমরা কাল এসেছিলাম । আর ডানদিকে, বারো কিলোমিটার দূরেই ঘুম । আমরা মধ্যপন্থা নিলাম । কোনোদিকে না গিয়ে সোজা ঢুকলাম । নাক বরাবর যেতে যেতেই এসে গেল মানেভঞ্জন । কত অনামী ট্রেকারের স্বপ্নপূরনের শুরু হয় এখানে ! 
আমাদের অবশ্য স্বপ্নভঙ্গের কেস  ! মানেভঞ্জন বাজারে যখন পৌঁছেছি, তখন তুমুল বৃষ্টি  ! আমরা ‘স্নো ফল’ ব’লে চেঁচিয়ে উঠতে যাবো, বুঝলাম, ওটি আদতে শিলাবৃষ্টি  !  
আমি পরিস্থিতি মাপতে নামলাম । সেই ঝড় বৃষ্টির মাঝেই  । জানতাম প্রাচীন পাহাড়ি প্রবাদ, 
‘সুরিয়া অস্ত, তো পাহাড় মস্ত’
আর আজ তো সুর্য প্রায় ওঠেই নি । তাই পাহাড় পুরো মদমস্ত ! 
‘ল্যান্ডরোভার’ কথাটা বলা মাত্রই লোকে বলে দিচ্ছে, 
-সাবজী, আজ তো মুশকিল হ্যায় । কোঈ নহী যায়েগা  !   
আমার দুইপাশে তখন দুই থমথমে মুখ । সিংগালিলা তো দূর অস্ত, পশুপতিও হওয়ার নয়............তাই বাদী-বিবাদী দুজনারই মুখ ভার ! “আমাকে হারাতে এসে তোমারও কি পরাজয় হয়নি” মার্কা এক্সপ্রেশন দিয়ে একে অন্যকে মাপছে ।
ওদের থমথমে মেঘে ঢাকা মুখ দেখে কি না জানি না, তবে বৃষ্টি একটু ধরলো । 
চোখে পড়লো, এক জায়গায় আগুন পোহানো চলছে । বুঝলাম, ওটা একটা দোকান । যে কোনো জায়গায়, আমার প্রথম করনীয় কাজ, লোকাল দোকানে চা খাওয়া । তাই সেই দোকানবাড়িতে ঢুকলাম । একটা গেরস্ত বাড়ির বসার জায়গাটাতে চা আর সামান্য মোমো ইত্যাদি বিক্রির ব্যবস্থা । পাহাড়ে খুব কমন ব্যাপার । ওদেরই ওয়াশরুমে একটু ফ্রেশ হওয়া গেল । সেখানকার পরিচ্ছন্নতার কথা না বললে কিছুই বলা হয় না । আর যেটা দেখলাম টয়লেট ঠাসা নানা আকার ও সাইজের বালতি, গামলা ইত্যাদি । সবগুলোতে জল ভরা আছে । পাহাড়ে জলের সমস্যা আছে জানতাম । আজ দেখলাম স্থানীয়রা কিভাবে তার মোকাবিলা করে । হ্যাটস অফ  !
তা সেই দোকানি পরিবারে আরও একটি সমস্যা দেখলাম । ধুন্সু । তাদের এক বছর তিন-চারেকের বিচ্ছু বাচ্চা ! বিচ্ছু, কিন্তু কি যে সুন্দর ! চা তৈরি হতে আধঘন্টাটাক লাগলো । পুরো সময় আগুন পোহানো আর সেই বিচ্ছুর সাথে দুষ্টুমিতে কাটলো । ধুন্সুর প্রতি আমার ঋণের শেষ নেই । আমার পরিবারের অনিবার্য ফাটল আটকেছে ও । ওকে দেখেই তো আমার গিন্নি আর ছেলেকে অনেকক্ষণ পরে হাসতে দেখলাম । কৃতজ্ঞতা দেখাতেই আর কি, চারটে চকোলেট কিনে দিয়েছিলাম । সে ব্যাটা একসাথে সবগুলো মুখে ঢুকিয়ে আনন্দে শুধু বলতে লাগলো, “এয় বল্লে বল্লে, এয় শাব্বা শাব্বা” ! 

এবারে  রক্তিমা আর পিঙ্কি মামলার রায় দিল । সম্পত্তির মামলায় রিসিভার বসানোর মতো ক’রে আদেশ দিল, আমরা সিংগালিলার রাস্তায় না গিয়ে অন্য দিকে যাবো । ওই যে রাস্তা-টা চিত্রে-র দিকে যাচ্ছে, ওটা ধরে এগোবো । যতদুর রাস্তা ভাল, ততদুর যাবো । তারপর ফিরে আসবো ।  এগোতে শুরু করলাম । ঘড়িতে তখনই বারোটা পেরিয়ে গেছে । 
দশ কিলোমিটার মতো উঠলাম । ঝলমলে রোদে, তখন ‘পাহাড় হাসছে’ । একটা বাঁকের মুখে দেখলাম ডানদিকে পাহাড়ের চূড়োয় বরফের পুরু আবরণ ।  পার্কিং-এর জায়গাও পেলাম । সুতরাং, দাঁড়াতেই হ’ল । স্কুল ফেরত বাচ্চারা বললো, এই জায়গাটার নাম খোপিটাড় । ফোটো তোলার ধুমের মাঝেই দেবদুতের মতো নেমে এল রোগা প্যাংলা মার্কা একটা মানুষ । নামটা অবশ্য খোলতাই, শ্যামবাহাদুর তামাং ! বললো, একটা ল্যান্ডরোভার নিয়ে খানিক ওপরে গেলেই নাকি বরফ আর বরফ ! আজই বরফ পড়েছে  !  কনকনে ঠান্ডার রহস্য বোঝা গেল ।
কিন্তু ল্যান্ডরোভার ড্রাইভারদের মনের রহস্য বোঝা গেল না । শ্যামবাহাদুরের অক্লান্ত চেষ্টাতেও তাদের মস্ত অবস্থার বরফ গললো না । অগত্যা, গাড়ি ঘুমাও ! ডেরাতে ফোন করে বলে দেওয়া হ’ল,   
-লাঞ্চ বানাও । আমরা আসছি । 
আমাদের ড্রাইভার হঠাৎ এসে বললো,
-কারও কথা শুনবেন না । আমি আপনাদের নিয়ে যাবো । শুধু আমি যখন বলবো যে আর যাওয়া যাবে না, তখন ফিরতে হবে । 
আমরা রাজী  ! হইহই ক’রে গাড়িতে বসা হ’ল ।
আধঘন্টাও হয় নি । গাড়ি থামলো । মনোজ গাড়ি থেকে নেমে হাতে কি একটা নিয়ে ফিরে এল । 
বরফ  ! পাতার ওপর বরফের পুরু আস্তরণ ! সাদা, মোটাসোটা অমলেট যেন !
পিঙ্কি লাফিয়ে উঠলো । ওর ট্যুর সাকসেসফুল, বরফ ছোঁয়া হয়ে গেছে । আমরা তখন রক্তের স্বাদ পেয়েছি । তাই, চাহিদা অনন্ত । 
মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ !
আবার ফোন গেল ডেরায় । লাঞ্চ লাগবে না । আমরা বরফ দেখতে যাচ্ছি !
খোপিটাড় থেকে মোটমুটি ঘন্টাখানেক গিয়েই আমরা সিমপ্লি অ-স্ট্রাক ! দূর থেকে দেখছি, 
রাস্তার দুপাশে ক্রমশ পুরু হচ্ছে বরফের লেয়ার । 
পাশের কনিফারের পাতায় মাখামাখি হয়ে আছে বরফের কুচি । 
ওপর থেকে সূর্যের আলো বরফের ওপর পড়ে ঠিকরে বেরোচ্ছে ।  
রাস্তা জুড়ে বরফের স্তর জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব । মাঝে সমান্তরাল দুটো চাকার দাগ বোঝাচ্ছে, এই রাস্তা মোটরেবল ! 
আমরা ধোত্রে পৌঁছোলাম ।
ধোত্রে  ! 
গোটা চল্লিশ হলুদ-সবুজ বাড়ি নিয়ে একটা গ্রাম । 
দুটো বাড়ি-কাম-দোকান । তাতে মোমো, নুডল, রুটি-সবজি আর চা-কফি পাওয়া যায় । কয়েকটা বাড়িতে হোমস্টের ব্যবস্থা আছে । জানালাগুলো সব কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে মুখ করা ! 
আর ধোত্রে পেরিয়ে রাস্তা যেখানে চিত্রে-র দিকে টার্ণ করছে, যেখানে বাঁদিকে প্রেয়ার ফ্ল্যাগের সারি, তার ঠিক উল্টো দিকে, রাস্তার ডানদিকে নিজের আগুনে রূপের ডালি নিয়ে দাঁড়িয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা, অলস দুপুরে মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলায় মেতেছে । ব্যাস, সিংগালিলা-বনাম-পশুপতি, চাইনিজ-বনাম-বাঙ্গালি খানা............সব ঝগড়া এক লহমায় শেষ  ! 
তারপর ঘন্টাখানেক, সঙ্গে শুধুই ধোত্রে ! তারপর ওখানকার হোমস্টের হদিশ নিয়ে, খেতে গেলাম । সেদিন বৃহস্পতিবার । একটা মোমোর দোকানে তাই শুধুই ভেজ মোমো পাওয়া যাবে । দোকানি মহিলা নিাজের থেকেই বললেন,
-বগলবালা দুকানমেঁ চিকেন মিলেগা  । 
শহুরে কম্পিটিশনে অভ্যস্ত আমাদের জন্য একটা সলিড ধাক্কা যেন ! এই সরলতা, এত ঔদার্য, কিভাবে পায় এই স্বল্প আয়ের মানুষগুলো !  
বরাবরই জেনে এসেছি, পাহাড়ে জিনিসের দাম বেশি । আমরা বলি, হিল সারচার্জ ! ওই দুটো দোকানেই ভেজিটেবল স্যুপ আর ম্যাগি দিয়ে তৈরি এক প্লেট স্যুপ নুডলের, এক প্লেট ভেজ মোমোর (মাত্র আট পিস থাকে) দাম তিরিশ টাকা । ভুল লিখি নি, তিরিশ টাকাই  ! একমাত্র মনিহারি দোকানটিতে গ্যাস লাইটারের দাম ? দশ টাকা । ঠিক যে দামে আমি মহামায়াতলা বা ঢাকুরিয়াতে কিনি । পাহাড় হাসছে কিনা জানি না, তবে পাহাড় ক্রমশই নাগালের মধ্যে আসছে । সেই দোকানেই বাঁধাকপি, স্কোয়াশ, রাইশাক, ধনেপাতা, টমাটো.........সব বিক্রি হচ্ছে প্রায় সমতলের দামে  ! 
আমরা আটজন । একটা দোকানে খেতে গেলে দেরী হয়ে যাবে । তাই দুই দোকানে ভাগ করে লাঞ্চ করা হল । স্যুপ নুডল আর মোমো । 
একটু গল্প বলি । তবে প্রথমেই বলি, যাঁরা ঝাল খান না, তাঁরা এটা পড়লেও ঝালে কষ্ট পাবেন । তাই সাবধান !
আমার সীমিত নেপালি ভাষাজ্ঞান নিয়ে বললাম, 
-ভাইই.........মো লাই দুইঠো ডাল্লে ! 
ডাল্লে খোরসানি হ’ল লাল লাল, কুলের মতো দেখতে পাহাড়ি লঙ্কা । দোকানী আমার ডাল্লে-প্রীতিতে পাহাড়ের জয় দেখলেন হয়তো । স্যুপে দুটো ডাল্লে কুচিয়ে দিলেন । তারপর আমার সামনে সেই স্যুপ-নুডল আসতে আমি আবার তাতে দু চামচ ডাল্লেবাটার চাটনি দিলাম । ফর্ক দিয়ে খানিক নুডল আর চামচ দিয়ে একটু স্যুপ মুখে দিলাম । স্যুপের গরম আর ডাল্লের গরম মিশে মুখের মাঝে সে কি যে একটা ঘটলো  ! বুঝলাম, ধোত্রে-তে কাঞ্চনজঙ্ঘা শুধু চোখের সামনে নয়, মুখের ভেতরেও থাকতে পারে ।  

আমার জীবনের সেরা তিনটে লাঞ্চের মধ্যে তিরিশ টাকা খরচের এই খাবারটাও থাকবে ! মোমো হাউস, জিন্দাবাদ ! 
আকাশ আবার মুখ গোমড়া ক’রে আসছে । ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘর পেরিয়েছে অনেক আগেই । তাই গাড়িতে ওঠা হ’ল । পেছনের দিকে তাকিয়ে রাস্তার সেই বাঁকটা দেখলাম, যে বাঁকে এ যাত্রা আর ডানদিকে যাওয়া হ’ল না ! 
এক বুক মন খারাপ আর একগাদা স্মৃতি নিয়ে ধোত্রে থেকে রওয়ানা হলাম । পথে কুয়াশা আর বৃষ্টি ! আবার ফগলাইট ! অবাক হয়ে দেখছিলাম ওই পাহাড়ি রাস্তায় সব চালকদেরই কি চূড়ান্ত ড্রাইভিং এথিকস আর ডিসিপ্লিন ! শহরে এমন হতে পারে না  ? 
সুখ্যেপোখরি, পোখরিয়াবং হয়ে আবার ডেরায় ফিরে আসা । দুপুরের লাঞ্চে ভাত-রুটি জোটে নি । তাই কিছু স্ন্যাক্সের অর্ডার করা হ’ল । চা খাওয়া হ’ল জমিয়ে । কাল আবার সকাল সকাল বেরোনো । সেই ঘুম, কালিম্পং হয়ে লোলেগাঁও ! তাই খানিক গোছানোর পালা । 
একটা বাটিতে দেখলাম কালকের লেফট ওভার চিনেবাদামভাজা পড়ে আছে ।
চা তো খাওয়া হয়ে গেছে ।
আচ্ছা, এই বাদামগুলো তাহলে কি শুধু শুধুই খাবো ? 🤔


Comments